ইতালির সরকার নিজের ভোটব্যাঙ্ক ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে সম্প্রতি এমন একটি বিধান প্রস্তাব করেছে, যার অধীনে সব ধরণের শুধুমাত্র মুখ ঢাকা আবরণ—যেমন বোরকা ও নিকাব—প্রকাশ্যে পরিহার নিষিদ্ধ করা হবে। এই বিলটির মূল কারণ হিসেবে প্রকল্পকারীরা “ইসলামিক সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা” (Islamic separatism) এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। নতুন আইন প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, দোকান, অফিস, হাসপাতাল—সব জায়গায় এই ধরনের মুখ ঢাকা পোশাক পরিধান করা যাবে না এবং লঙ্ঘনকারীদের সর্বনিম্ন ৩০০ ইউরো থেকে সর্বোচ্চ ৩,০০০ ইউরো জরিমানা চাপিয়ে দেওয়া হবে।
এই প্রস্তাব একটি বিস্তৃত আইন প্যাকেজের অংশ, যা শুধুমাত্র মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করতেই সীমাবদ্ধ নেই — এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা, মুসলিম সংস্থাগুলোর অনিচ্ছাকৃত অর্থ গ্রহণ, জোরপূর্বক বিবাহ ও কোনো ধরনের ‘কর্ম-সংস্কৃত অপরাধ’ (cultural crimes), যেমন কন্যা শ্লীলতা পরীক্ষা (virginity testing)-এর প্রতিরোধ ও শাস্তি সংক্রান্ত আদান-প্রদানও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

11 Oct 2025 | Pic: Collected
বর্তমানে ইতালির মুসলিম জনসংখ্যা দুই মিলিয়ন (২০ লক্ষ) এর কাছাকাছি বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহিলারা, বিশেষ করে অভিবাসী ও মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া তরুণীরা, যারা ইতালিতে বেড়ে উঠেছেন, তাদের ওপর এই আইন বিশেষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। সমালোচকরা বলছেন, আইনটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একধরনের হস্তক্ষেপ, এবং এটি সামাজিক বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমানে ইতালির বিভিন্ন প্রদেশ ইতিমধ্যে অংশিক মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করেছে — যেমন লোম্বার্ডি প্রদেশ ২০১৫ সালে পাবলিক ভবন ও হাসপাতালগুলিতে মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করেছিল। তবে এই নতুন প্রস্তাবটি তার থেকে অনেক বেশি সার্বভৌম — পুরো দেশের জন্য এটি প্রযোজ্য হবে।
আইনটি শুধু পোশাক নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয় — প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যে ধর্মীয় সংগঠনগুলি ইতিমধ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত নয়, তাদেরকে তাদের সব উৎস ও অনুদানের তথ্য প্রকাশ করতে হবে, বিশেষ করে বিদেশি অর্থ বা অনুদান যেগুলি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা সাংবিধানিক সনদের কাছে হুমকি হতে পারে। একই সঙ্গে, জোরপূর্বক বিবাহকে নিষিদ্ধ করার দিক থেকে আইনকে শক্তিশালী করার নির্দেশ রয়েছে — ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় বিবাহ বন্ধনে বাধ্য করার অপরাধকে শাস্তিযোগ্য হিসেবে দেখতে বলা হয়েছে।
আইন প্রস্তাবকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে, “ধর্মীয় স্বাধীনতা মহাদরকারী, কিন্তু তা প্রকাশ এবং স্বচ্ছতার অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মূলনীতির সমর্থনে”। তাদের দাবি, মুখ ঢাকা পোশাক স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে সমাজে “শারিয়া অধ্যুষিত আলাদা জনগোষ্ঠী” গঠনের প্রবণতা হয়, যা সমাজ ও আইন ব্যবস্থার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ রূপে দেখা যেতে পারে।
আনুষ্ঠানিকভাবে আইন সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে, এবং মেলোনির দলসহ যে দলের সমর্থন রয়েছে, তাদের সংসদে প্রতিষ্ঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় অনুমোদন পেতে আইনটিকে অনেক বেশি সম্ভাবনা বলে ধরা হচ্ছে। যদিও এখনও আইন debates (আলোচনা) শুরু হয়নি বা তার নির্ধারিত সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
অন্যদিকে, এই প্রস্তাবকে লোক ও সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে সমালোচনা শুরু করেছে। একাধিক মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সংগঠন বলেছে, এটি এক “আওторিটারি ও ধর্মবিরোধী” উদ্যোগ — যারা মুখ ঢাকা পোশাক পরিধান করতে চায়, তাদের অধিকার বিনষ্ট করার চক্রান্ত।
ইউরোপে মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার প্রবণতা নতুন নয় — ফ্রান্স ২০১১ সালে সার্বজনীনভাবে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করেছে, এবং সেই আইনকে ইউরোপীয় আদালত (European Court of Human Rights) সমর্থনও দিয়েছে। ইতালিতেও ১৯৭৫ সালের একটি আইন রয়েছে, যা মুখ ঢাকা পোশাক ও মুখ ঢাকা অবয়ব আচ্ছাদন বন্ধ করে— কিন্তু সেই আইন “যে কেউ শনাক্ত হওয়া যাবে না এমন পোশাক পরিধান করবে না” নির্দেশ দেয়, তবে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে কোনো রূপের ছাড়ও দিচ্ছে।
এই প্রস্তাবিত আইন বাস্তবতা পায় কি না, ও তার প্রভাব কী হবে — তা সময়ই বলবে। তবে এখনই স্পষ্ট যে, এই প্রস্তাব ইতালির মুসলিম সম্প্রদায়, মানবাধিকার গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি করেছে। আগামী দিনগুলিতে আইনটি সংসদে পাস পেলে, ইটভেঙ্গে বলা যেতে পারে — ইতালির ধর্ম ও সমাজ ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগ শুরু হতে চলেছে।




