ইসরায়েল গাজা উপত্যকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা ত্রাণবাহী নৌবহর ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’ থেকে আটক করা ১৭১ জনকে মুক্তি দিয়েছে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত সুইডিশ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক ছিলেন, যাদের মধ্যে গ্রিস, ইতালি, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, জার্মানি, বুলগেরিয়া, লিথুয়ানিয়া, অস্ট্রিয়া, লুক্সেমবার্গ, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, স্লোভাকিয়া, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, যুক্তরাজ্য, সার্বিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অন্তর্ভুক্ত।

7 Oct 2025 | Pic: Collected
মুক্তিপ্রাপ্তদের অধিকাংশকে গ্রিস ও স্লোভাকিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, আটককৃতরা গাজা উপত্যকার মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, তবে ইসরায়েলি নৌবাহিনী তা প্রতিহত করে এবং তাদের আটক করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও ত্রাণকর্মীরা এ অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিবিসি জানিয়েছে, ফ্লোটিলাটি গাজায় অবরোধের মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য, ওষুধ ও ত্রাণ সামগ্রী বহন করছিল। কিন্তু ইসরায়েলি নৌবাহিনী দাবি করে, জাহাজগুলো অনুমতি ছাড়া ‘নিরাপত্তা সংবেদনশীল অঞ্চল’-এ প্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মিশরে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই হামাসের প্রতিনিধিদল মিশরে পৌঁছেছে এবং ইসরায়েলের প্রতিনিধিদেরও সেখানে যাওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই বৈঠকগুলোর মাধ্যমে দুই বছর ধরে চলা গাজা সংঘাতের অবসান ঘটানোর পথ তৈরি হতে পারে। হামাসের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন খলিল আল-হায়া, যিনি কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিলেন।
তিনিই বর্তমানে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় মূল প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমাকে জানানো হয়েছে, আলোচনার প্রথম ধাপ এই সপ্তাহেই শেষ হবে। আমি সবাইকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলেছি।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে অনেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সক্রিয় মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন। তবে কিছু পর্যবেক্ষক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন ভূমিকা কূটনৈতিকভাবে প্রশংসনীয় হলেও এর ভেতরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে, বিশেষ করে মার্কিন নির্বাচনের বছর বিবেচনায়। ফ্লোটিলা থেকে আটককৃত ব্যক্তিদের মুক্তির পর রেড ক্রস (ICRC) জানিয়েছে, তারা গাজায় মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমে আরও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং একইসঙ্গে হামাসের কাছ থেকে ইসরায়েলি বন্দিদের ফিরিয়ে আনতেও সহায়তা করবে। সংস্থাটি বলেছে, “আমাদের লক্ষ্য হলো মানবিক সমন্বয় বাড়ানো, যাতে গাজার সাধারণ মানুষের কাছে সাহায্য দ্রুত পৌঁছায়।” অন্যদিকে, ইসরায়েল বলছে, ফ্লোটিলার সঙ্গে থাকা কিছু ব্যক্তি “অবৈধ সংগঠনের সঙ্গে জড়িত” এবং নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযান চালানো হয়েছিল।
তবে আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশ এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। গ্রেটা থুনবার্গ তার মুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়াকে অপরাধ বলা যায় না। গাজায় মানুষ মরছে, আর আমরা ন্যায়বিচারের জন্য একসঙ্গে দাঁড়াব।” তার এই বক্তব্যে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। অনেকেই এটিকে ‘মানবতার পক্ষে কণ্ঠস্বর’ বলে অভিহিত করেছেন। গাজা যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে ঘিরে এখন কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি, তবুও এই মুক্তির ঘটনাটি আলোচনার পরিবেশকে ইতিবাচক করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা বলছেন, গ্রেটা থুনবার্গের মতো বিশ্বখ্যাত কর্মীদের সম্পৃক্ততা ইসরায়েলি নীতির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে এবং মানবিক বিষয়টিকে সামনে আনবে। ফ্লোটিলা আটক ও মুক্তির এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, গাজা সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে।




