সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরাইলের মধ্যে একটি গোপন অস্ত্রচুক্তি ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ ফাঁস হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে। ফরাসি অনুসন্ধানী গণমাধ্যম ‘ইন্টেলিজেন্স অনলাইন’ এই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে, যা ইসরাইলি এলবিট সিস্টেমস নামে একটি শীর্ষ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং আমিরাতের মধ্যে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ২৩০ কোটি ডলার) একটি বড় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি চুক্তি সম্পর্কে তথ্য উন্মোচিত করেছে — এবং এতে অনেক গোপনীয় শর্ত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয় আছে।

20 Dec 2025 | Pic: Collected
এই চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হওয়া গোপন স্বাক্ষরিত চুক্তির আবরণ উন্মোচন করায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চুক্তিটি সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
চুক্তির মূল বিষয়
- প্রতিষ্ঠান এবং মূল্য: ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমস (Elbit Systems) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি গোপনভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা এখন চাঞ্চল্যকর হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।
- প্রযুক্তি ও সামগ্রী: চুক্তির অধীনে আমিরাত জে-মিউজিক (J-MUSIC) নামে একটি অত্যাধুনিক বিমান সুরক্ষা ব্যবস্থা কিনবে, যা লেজারভিত্তিক প্রযুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সেন্সরকে অকার্যকর করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এই প্রযুক্তি মূলত বিমান ও ভূমি-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হবে বলে বলা হচ্ছে।
- যৌথ উৎপাদন: চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব প্রযুক্তি ইউএই-এর ভেতরেই যৌথ প্রকল্প হিসেবে উৎপাদিত হবে, অর্থাৎ আমিরাত ও ইসরাইল উভয়ের শ্রম, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল মিলিয়ে এটি তৈরি ও ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।
- সময়কাল: এই চুক্তি বাস্তবায়নে সর্বমোট আট বছর সময় ধরা হয়েছে এবং এটি ইসরাইলের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক রপ্তানি চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
- গোপনীয়তা: চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখনও গোপন রাখা হয়েছে, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সংবেদনশীলতা ও কৌশলগত গোপনীয়তার কারণে সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
এই চুক্তি প্রকাশিত হবার পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে যে এই ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এবং বেসামরিক জনগণের উপর ক্ষতিকর সরঞ্জামের ব্যবহার বা রপ্তানির সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। এই সংগঠনগুলোর মধ্যে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রয়েছে, যারা এর সম্ভাব্য মানবিক বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে, চুক্তির তথ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এমন সময়ে যখন ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘আব্রাহাম চুক্তি’ (Abraham Accords) এরপর আরও গভীর হচ্ছে, যা ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ইস্রায়েল ও আরব বিশ্বের কিছু দেশদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত। এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং কৌশলগত সহযোগিতা এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির গুরুত্ব
এলবিট সিস্টেমস হলো ইসরাইলের অন্যতম প্রধান সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যা উন্নতমানের ড্রোন প্রযুক্তি, বিমানভিত্তিক সেন্সর, রাডার ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রতিরক্ষা সিস্টেম তৈরি করে থাকে। তাদের বানানো জে-মিউজিক শুরক্ষার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি হিসেবে ধরা হয় যা ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতিসম্পন্ন হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ
এই চুক্তি শুধুমাত্র অস্ত্র বিক্রির অর্থনৈতিক হিসাব নয়, বরং এটি ইসরায়েল ও ইউএই-এর কৌশলগত সম্পর্ককে আরো ঘনীভূত করার ইঙ্গিত দেয়. মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দুর্দশার মধ্যে ইসরাইল ও আমিরাত উভয়ই সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, বিশেষত আইরান, ইয়েমেন ও অন্যান্য মাল্টি-স্টেক홀্ড সংঘাতক্ষেত্রের পটভূমিতে।
মানবাধিকার ও আইনগত উদ্বেগ
মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, Geneva Convention ও বিভিন্ন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুসারে এই ধরনের প্রতিরক্ষা চুক্তিকে হুমকিস্বরূপ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, যদি এই সুরক্ষা ব্যবস্থা পরিস্থিতি বদলে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় বা বেসামরিক নাগরিকদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা হলে আন্তর্জাতিক নীতিতে তা গভীর নিন্দার যোগ্য হতে পারে।
চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একটি নয়া পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে আর ইউএই তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা উপক্রমশক্তি জোরদার করতে পারবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রযুক্তির প্রতি চাহিদা ও প্রতিযোগিতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভারসাম্যের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সংক্ষেপে, প্রকাশিত গোপন তথ্য অনুযায়ী ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারের একটি গোপন অস্ত্রচুক্তি রাষ্ট্রগুলোকে শুধুমাত্র সমঝোতা ও সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক নীতিমালা, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ব্যালান্স ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার একটি নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।




