নেপালের প্রথাগত রাজনীতিতে এক অপেক্ষাকৃত নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে, যেখানে সাবেক জনপ্রিয় র্যাপার ও বর্তমান কাঠমান্ডু মেয়র বালেন্দ্র শাহ, যিনি সাধারণভাবে ‘বালেন শাহ’ নামে পরিচিত, আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে দৌড়ঝাঁপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি সংকটাকালীন গণঅভ্যুত্থান ও যুবসমাজের দাবির পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, এবং দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে শাসিত প্রধান দলগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে ব্যাপক বিক্ষোভ জারি ছিল, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে দমন ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে ৭৭ জনের মৃত্যুর মতো মানবিক ক্ষতিও হয়েছে। এই আন্দোলনের প্রভাবেই প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন এবং সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে ধরা পড়ে, যা আগামী ৫ মার্চ ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
জেন-জি বিক্ষোভের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি যথেষ্ট বদলেছে এবং এতে লক্ষণীয় হয়েছে যে তরুণ ভোটাররা রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ — নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩০ মিলিয়নের মধ্যে ১৯ মিলিয়ন ভোটারই ভোটাধিকার ব্যবহার করতে পারবেন, যেখানে প্রায় এক মিলিয়ন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে, বিশেষ করে যুবসমাজের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে।
বালেন্দ্র শাহ, ৩৫ বছর বয়সী এই রাজনৈতিক ব্যক্তি, আগে একজন র্যাপার ও সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন এবং পরবর্তীতে কাঠমান্ডু মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন, যা অভাবনীয় সরকারের গতিশীলতা হিসেবে ধরা হচ্ছে। তিনি সম্প্রতি Rastriya Swatantra Party (RSP)-তে (জাতীয় স্বাধীনতা পার্টি) যোগ দিয়েছেন, যা রবি লামিছানে নেতৃত্বাধীন একটি নতুন রাজনৈতিক দল।
এ দলটি এবং বালেন শাহ একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেছেন যার একটি মৌলিক শর্ত হলো:
✔️ যদি RSP ৫ মার্চ নির্বাচন জয় করে, তাহলে বালেন শাহ হবেন প্রধানমন্ত্রী, আর
✔️ রবি লামিছানে থাকবেন দলীয় প্রধান।
দলটি ‘জেন-জি’ আন্দোলনে উত্থাপিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, গণতান্ত্রিক সংস্কার, তরুণদের দাবিসমূহ চাওয়া ইত্যাদি ইস্যুগুলোর সমাধানে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বালেনের মতো একজন তরুণ, বর্ণাঢ্য ব্যাক্তিত্ব রাজনীতিতে প্রবেশ, এবং একটি উদীয়মান দল-সহ প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী হওয়া, তা নেপালের পুরনো শক্তিশালী দলগুলো — যেমন UML (Communist Party of Nepal বা ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট) এবং নেপালি কংগ্রেস — এর দীর্ঘদিনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বালেন সাম্প্রতিক আন্দোলনে যুব সমাজের অঘোষিত এক নেতা হিসেবে অবস্থান গঠন করেন এবং স্বেচ্ছাসেবী নেতৃত্ব ও অনলাইন উপস্থিতি এর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন, যদিও কিছু সমালোচক বলছেন তিনি বিক্ষোভের সময় পাবলিক ইভেন্টে কম উপস্থিত ছিলেন এবং মূলত অনলাইনে সমর্থকদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পুরাতন রাজনৈতিক দলগুলো তিন দশক ধরে নেপাল রাজনীতিকে পরিচালনা করে আসছে, কিন্তু তরুণ ভোটারদের অসন্তোষ ও তাদের নতুন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ এই ব্যবস্থাকে ভাঙচুর করতে ও রূপান্তরিত করতে সক্ষম হচ্ছে। জেন-জি বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেক তরুণকে যথাসময়ে ভোট ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে, যা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বদলে দিতে পারে।
তবে বিভিন্ন রাজনীতিক ও সমালোচকের মতে, বালেন ও রবি লামিছানে তাঁদের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার অভাব ও আইনি ঝামেলা সত্ত্বেও একটি মূল রাজনৈতিক দল হিসেবে কীভাবে টিকবে, তা ভাবনার বিষয়। লামিছানে সম্প্রতি আদালতের জরিমানা-ভিত্তিক ছাড়পত্রে মুকুট থেকে বের হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, যা কিছু মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে — তবে বিশ্লেষকরা এটিকে একটি কৌশলগত দিক হিসেবেও দেখছেন।
নেপালের ৫ মার্চ ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে বিএনসিসহ নতুন ভোটারদের ভারতীয় রাজনীতি-সম-ধারার মতো এবার একটি তরুণ-নেতৃত্ত্বাধীন নির্বাচন হচ্ছে, যেখানে রাজনৈতিক ধারায় বিশাল পরিবর্তন ঘটতে পারে। বালেনের অংশগ্রহণ ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হওয়া নির্বাচনী দৃশ্যকে একেবারেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে।




