তুরস্কের রাজধানী **আঙ্কারা থেকে রওনা হওয়ার পর একটি প্রাইভেট জেট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন **লিবিয়ার সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আলি আহমেদ আল-হাদ্দাদ (Lieutenant General Mohammed Ali Ahmed al-Haddad) সহ অন্যান্য শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা। এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ সাল রাতে আঙ্কারার কাছে ঘটে, যা লিবিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক শোক ও সতর্কতার সৃষ্টি করেছে।
25 Dec 2025 | Pic: Collected
ঘটনার সময় বিমানটিকে Harmony Jets Flight 185 নামে চিহ্নিত করা হয়েছে; এটি একটি ডাস্সল্ট ফ্যালকন ৫০ (Dassault Falcon 50) প্রাইভেট জেট ছিল, যা আঙ্কারা থেকে ত্রিপোলির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। বিমানে মোট আট জন আরোহী ছিলেন—জেনারেল হাদ্দাদ ও তাঁর চার জন শীর্ষ সামরিক সহকর্মী, পাশাপাশি তিনজন পাইলট এবং ক্রু সদস্য। সকলেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
তুর্কি কর্মকর্তারা জানায়, বিমানটি উড্ডয়ন করে কেবলমাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে এটি আঙ্কারার হায়মানা জেলার কেসিককাভাক এলাকায় বিধ্বস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়, যেখানে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজ শুরু হয়। তুর্কি কর্তৃপক্ষ বিমান বিধ্বস্তের প্রাথমিক কারণ হিসেবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও বৈদ্যুতিক পদ্ধতির ব্যর্থতা উল্লেখ করেছেন। সর্তক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিমানটি জরুরি অবতরণের অনুমতি চাইতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু যোগাযোগ পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি।
বিআইএসএস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) জানিয়েছে, ঘটনাটি “এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা” হিসেবে লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ ডেবেইবা (Abdulhamid Dbeibah) ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি বিশাল ক্ষতি — আমরা এমন এক ক্ষণিকের জন্যও যারা আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশকে সেবা করেছেন তাঁদের হারিয়ে ফেলেছি।”
জেনারেল আল-হাদ্দাদ লিবিয়ার সক্রিয় ও জাতিসংঘ-সমর্থিত Government of National Unity (GNU)-র সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। তিনি ২০২০ সাল থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সামরিক সংহতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে লিবিয়ার বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সংহতি ও সমন্বয়ের চেষ্টা অব্যাহত ছিল, যা দেশটির দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক বিভাজনের পর একটি স্থিতিশীল যৌথ বাহিনীর পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ ছিল।
দুর্ঘটনায় নিহত অন্যান্য লিবীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন — গ্রাউন্ড ফোর্সেস চিফ অব স্টাফ আল-ফিতৌরি ঘারিবিল (General Al-Fitouri Gharibil), মিলিটারি ম্যানুফ্যাকচারিং অথরিটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদ আল-কাতাউই (Brig. Gen. Mahmoud Al-Qatawi), উপদেষ্টা মুহাম্মদ আল-আসাউই দিয়াব (Mohammed Al-Assawi Diab) এবং সামরিক ফটোগ্রাফার মুহাম্মদ ওমর আহমেদ মাহজুব (Mohammed Omar Ahmed Mahjoub)। এছাড়া তিনজন ক্রু সদস্যও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।
এই দুর্ঘটনা তুরস্ক ও লিবিয়ার মধ্যকার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও কঠিন এক বাস্তবতায় এনে দিয়েছে। জানা যায়, জেনারেল হাদ্দাদ ও তাঁর প্রতিনিধিদল তুরস্কে তুর্কি সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, যা দুই দেশের মধ্যকার সামরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করতে সহায়তা করার লক্ষ্যে করা হয়েছিল।
ত্রিপোলিতে দুর্ঘটনার পর লিবিয়া সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে, যেখানে সরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবার ও নিহতদের সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং নিহতদের স্মরণে প্রার্থনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই দুর্ঘটনা কেবল একটি বিমানের বিধ্বস্ত ঘটনা নয়; এটি লিবিয়ার সামরিক নেতৃত্বের ওপর একটি বড় ধাক্কা এবং আগামীতে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। জেনারেল হাদ্দাদ ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি বিভিন্ন সামরিক অনিয়ম ও বিচ্ছিন্ন সামরিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন, যা দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।
তুর্কি ও লিবীয় তদন্তকারী দল একসঙ্গে বিমান বিধ্বস্তের আসল কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে এবং ব্ল্যাক বক্স তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তুর্কি কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকার পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করবে এবং সবাইকে জানাবে ফলাফল কী হয়। প্রাথমিক তদন্তে সন্ত্রাস বা যেকোনো আক্রমণের কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, বরং প্রযুক্তিগত ত্রুটিই মূল কারণ মনে করা হচ্ছে।
এই সংবাদটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, কারণ লিবিয়ার সামরিক নেতৃত্বের এমন ভয়াবহ ক্ষতি দেশটির স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যখন তুরস্ক ও লিবিয়ার সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক গত কয়েক বছরে আরও মজবুত হয়েছে।



