ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আবারও নাগরিকত্ব নিয়ে আলোচিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে শুরু হওয়া ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রমে জনমনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি এমন এক ভয়ঙ্কর মাত্রায় পৌঁছেছে যে, সাম্প্রতিক ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বীরভূম জেলার ইলামবাজার, দিনহাটা এবং পানিহাটিতে তিনটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনা ইলামবাজারে ৯৫ বছর বয়সী ক্ষিতিশ মজুমদারের। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের বরিশালের বাসিন্দা এই বৃদ্ধ চার দশক আগে ভারতে আসেন এবং জীবনের শেষ পর্যায়ে আবার নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে আত্মহত্যা করেন। ক্ষিতিশবাবু ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজের নাম না থাকার কারণে আতঙ্কিত ছিলেন। তার পরিবার জানাচ্ছে, তিনি বারবার প্রশ্ন করতেন—“আমাদের কি বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে?” এই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনের ইতি টানেন তিনি।

31 Oct 2025 | Pic: Collected
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, “ভয়, বিভাজন এবং ঘৃণার রাজনীতির করুণ পরিণতি আমরা প্রত্যক্ষ করছি। জনগণের অধিকার রক্ষায় আমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়ব।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা প্ররোচিত না হন এবং আশ্বস্ত ছিলেন যে কোনো দরজা দিয়েই বাংলায় এনআরসি (National Register of Citizens) বাস্তবায়ন হতে দেবেন না। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, রাজ্য সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য হবে এবং আমরা সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।
ক্ষিতিশ মজুমদারের মেয়ে, পুতুল বিশ্বাস, জানিয়েছেন যে, তার বাবার মধ্যে SIR এবং এনআরসি নিয়ে প্রচণ্ড ভয় ও আতঙ্ক ছিল। তিনি বারবার জিজ্ঞাসা করতেন, “আমাদের কি বাংলাদেশে পাঠাবে?” এই ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা বৃদ্ধের মনোবল ভেঙে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের জীবন শেষ করে দেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও জানিয়েছেন, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে কি তাঁকে অবৈধ নাগরিক ঘোষণা করা হবে, তা নিয়েও ক্রমেই সন্দেহ জন্ম নিয়েছিল।
রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় নাগরিকত্ব নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটার তালিকা আপডেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং অসহায়ত্ব বেড়েই চলেছে। এই আতঙ্ক শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, কিন্তু জন্মসূত্রে বাংলাদেশ বা অন্যান্য দেশের নাগরিক ছিলেন, তারা সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণ এবং নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া যদি সীমাহীনভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্যের সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারী বৈঠক ও গণমাধ্যমে বারবার জোর দিয়েছেন যে, রাজ্য সরকারের লক্ষ্য জনগণের নাগরিকত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিনি কেন্দ্রকে সতর্ক করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে কোনোভাবেই এনআরসি বাস্তবায়ন হতে দেওয়া হবে না এবং রাজ্য সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মমতার নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলো এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সাধারণ মানুষের আতঙ্ক নিরসন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য একজোট হয়েছে।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষ SIR প্রক্রিয়ার ফলে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, ভুল তথ্য, এবং নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার জটিলতা মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি, কারণ বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ মানসিক চাপ সহ্য করতে পারছেন না। এই প্রক্রিয়া পরিবার ও সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। (Jugantor)
রাজ্যের প্রশাসন এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার জনগণকে আশ্বস্ত করেছেন যে, কোনো প্ররোচনা বা ভুল তথ্যের কারণে আতঙ্কিত হবেন না। রাজ্য সরকার সকলের নাগরিকত্ব, ভোটার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ করে বারবার বলেছেন, “আমরা বাংলার জনগণকে কেন্দ্রের ভয়াবহ নীতি থেকে রক্ষা করতে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ব।”
উপসংহারে, পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং ভোটার তালিকা পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রম কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং মানসিক চাপ বেড়েছে, এমনকি মৃত্যুও ঘটেছে। রাজ্য সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই সংকট পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব বেড়ে গেছে এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের প্রতিশ্রুতিতে আশ্রয় খুঁজছেন। এই ঘটনায় রাজ্য এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ নাগরিকত্ব, ভোটার তালিকা এবং ব্যক্তিগত অধিকার সংরক্ষণ এখন প্রধান গণতান্ত্রিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।




