রাশিয়া নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ‘ওরেশনিক’ (Oreshnik) বেলারুশে মোতায়েন করেছে, এবং এটি এখন “যুদ্ধ প্রস্তুত” অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো বৃহস্পতিবার ১৮ ডিসেম্বর ঘোষণা করেছেন, যা উঠে এসেছে এটি গত বুধবারই বেলারুশে পৌঁছেছে ও সেখানে স্থায়ীভাবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই তথ্য বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে কারণ রাশিয়ার এই পদক্ষেপ নাটো ও ইউরোপীয় কাঠামোর সাথে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে, এবং এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা – অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ – যুদ্ধের গহ্বরে একটি বড় ইস্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে।

19 Dec 2025 | Pic: Collected
রাশিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রধানত “ওরেশনিক” বা Oreshnik নামে পরিচিত, যা মধ্য-পল্লার (intermediate-range) ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবেও বিবেচিত হয় এবং বলা হচ্ছে এটি পারমাণবিক বা কনভেনশনাল (প্রচলিত) যুদ্ধোপযোগী উভয় ধরনের হেড ধারণ করতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র ধারণক্ষমতা এবং শৃঙ্খলা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করেছে, বিশেষত কারণ ২০১৯ সালের পর থেকে মধ্য-পল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্বন্ধীয় চুক্তি বন্ধ রয়েছে এবং রাশিয়া-নাটো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দায়ভার নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
কেন মোতায়েন করল রাশিয়া?
লুকাশেঙ্কো বলেন, রাশিয়া ও বেলারুশ “যুদ্ধ প্রস্তুত অবস্থায়” এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে এসেছে যা যদি পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে তখন আঘাত করার সক্ষমতা দেবার উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে, এবং এটি মিনস্কের ছক অনুযায়ী ডিসেম্বরে মোতায়েন করা হবে বলে শুরু থেকেই পরিকল্পনা ছিল। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আগে থেকে এটি ২০২৫ সালের শেষের মধ্যে মোতায়েন করা হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন।
মুখ্যত এটি ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ঘটে যাচ্ছে, যেখানে রাশিয়া পূর্বে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের নাই উক্ত সামর্থ্যও প্রদর্শন করেছে — ২০২৪ সালের নভেম্বরে সে একটি Oreshnik ব্যবহারের খবর দিয়েছে, যদিও তখন তা পারমাণবিক হেড বহন করেনি। ইউক্রেনের দিকে পশ্চিমা সরঞ্জামযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পর রুশ প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাশিয়ার পক্ষ যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি এ কাজকে বিরোধী পক্ষ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অগ্রহণযোগ্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বেলারুশ ও রাশিয়ার কাছে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণস্কেল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেলারুশ রাশিয়ার পারমাণবিক কৌশলগত মহড়ায় যুক্ত হয়েছে এবং রুশ Iskander-M ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম ও পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র আগেই স্থাপন করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উত্সে দাবি পাওয়া গেছে। এর ফলে বেলারুশ পূর্বে নিরপেক্ষ ও পারমাণবিক অস্ত্র-মুক্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত থাকলেও তা বদলেছে এবং দেশটি রাশিয়ার পারমাণবিক ছাতার আওতায় এসেছে।
জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পর্যায়ে এই ধরণের মোতায়েন নাটো সদস্য দেশগুলো বিশেষত পোল্যান্ড ও ব্যাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে — যেমন পোল্যান্ডের বিমান ঘাঁটি বা ব্রাসেলস-এ ন্যাটো সদর দপ্তর পর্যন্ত কম সময়ে পৌঁছানোর ক্ষমতা থাকতে পারে বলে রুশ সাংবাদ মাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে, যদিও নিশ্চিতভাবে পারমাণবিক হেড বহন করছে কি না তা আগে থেকে জানা যায় না।
সামরিক মহড়া ও অন্যান্য প্রস্তুতি
এ বছরের সেপ্টেম্বরেও Zapad-2025 নামে রাশিয়া-বেলারুশ যৌথ কৌশলগত সামরিক মহড়া হয়েছিল, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনার সমাবেশসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তা নিয়েও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বর্তমান মোতায়েন সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে Minsk ও Moscow একত্রে রাশিয়া-নাটো উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান জোরদার করছে।
নাটো, ইউরোপ ও নিরাপত্তা ব্যালান্স
এ ধরনের পারমাণবিক সক্ষমতা সংযুক্ত করা ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে কারণ যা পূর্বে সংঘাতের সময় সীমাবদ্ধ কৌশলগত অস্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত হতো, তা এখন আঞ্চলিক কৌশলগত উত্তেজনার একটি অংশ হিসেবে দৃশ্যমান হচ্ছে। ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা শক্তিরা এই ধরনের মোতায়েনকে কঠোর নজরে রেখে প্রতিক্রিয়া তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, এবং এটি সামনের দিনগুলোর কূটনৈতিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




