সিরিয়ার হোমস শহরে অবস্থিত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) নামাজ চলাকালীন ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত আটজন নিহত ও আরও বহু আহত হয়েছেন, এবং এই ঘটনাকে ইরানসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা তীব্রভাবে নিন্দা করেছে। এই হামলা সিরিয়ার চলমান সহিংসতা ও নিরাপত্তা সংকটকে আবারও সামনে এনেছে।
27 Dec 2025 | Pic: Collected
হোমসের ওয়াদি আল-ধাহাব এলাকায় ইমাম আলী অনাবিদিত মসজিদের মূল নামাজ কক্ষে একটি বিস্ফোরক ডিভাইস সক্রিয় হয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে অন্তত আটজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে নিরাপত্তা বাহিনী ইঙ্গিত দিয়েছে। বিস্ফোরণে মসজিদের দেয়াল, জানালা ও অন্তর্গত অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং মসজিদে চিরস্থায়ী আতঙ্ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে নগ্ন আঘাত এবং দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে ভঙ্গ করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এক অপরাধ।” সিরিয়ার সরকারের বক্তারা এই ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিরিয়ায় চলমান সন্ত্রাসী সহিংসতার মধ্যে এই হামলা শুধু ধর্মীয় স্থানে আক্রান্তি নয়, বরং সম্পূর্ণ সমাজ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এটি ধর্মের পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
ইরান স্বঘোষিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী নীতি অনুসারে এই হামলাকে একেবারেই নিন্দনীয় ও ঘৃণিত কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমায়েল বাগাই এক বিবৃতিতে বলেন, এই হামলা “নিরীহ শ্রোতাদের এবং একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে” এবং এটি নাগরিকদের প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতার এক স্পষ্ট প্রকাশ। তিনি আহতদের দ্রুত সেরে ওঠার কামনা করেন এবং নিহতদের পরিবার ও সিরিয়ার জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। ইরান এই ধরনের হামলা কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করেছে এবং সন্ত্রাসীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জোর দিয়েছেন।
ইরান আরও বলেছে যে সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষিপ্ত সহিংসতার শিকার এবং অন্তত কিছুভাবে অনধিকারিক বিদেশি হস্তক্ষেপ ও দেশটির সার্বভৌমত্বে লঙ্ঘনের কারণে এই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে, যা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সম্প্রসারণ ও কার্যক্রমকে সহজ করেছে। ইরান এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে এবং একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার শেষ না হলে স্থায়ী শান্তি আসবে না বলে মন্তব্য করেছে।
এই মসজিদে হামলার বিরুদ্ধে শুধু ইরানই নিন্দা জানিয়েছে; বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং অনেক দেশের সরকারও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার অনুরোধ জানাচ্ছে। আরবি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং ধর্মীয় স্থানে সহিংসতার বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়াই করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে।
সিরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংস সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ, বিভিন্ন তৎপর সশস্ত্র গোষ্ঠী, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার ফলে দেশটি এখনও শোষণবাদ, সহিংসতা ও পরস্পর বিরোধী হামলার শিকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হোমস শহর এবং অন্যান্য অংশেও ভিন্ন মতাদর্শ ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সারায়া আনসার আল-সুন্নাহ নামে পরিচিত একটি দল ইতোমধ্যে কয়েকটি হামলার দায় স্বীকার করেছে, যদিও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নিরাপত্তা সংস্থা বিতর্ক করে চলেছেন। এটি সিরিয়ার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি ব্যাধি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এই হামলার বিরোধী প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায় যে ধর্মীয় স্থানে সহিংস হামলা আর কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, এবং শান্তি ও সহাবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একটি সমাজ গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা অপরিহার্য। ইরান ও অন্যান্য দেশগুলো এই ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা সকল দেশের দায়িত্ব।”
এই ঘটনা সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে, এবং এটি আবারও প্রমাণ করেছে যে ধর্মীয় সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ মানুষের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে।



