যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক দফতর (DHS)-এর আওতাধীন আইসিই সম্প্রতি এমন একটি উদ্যোগ চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে একা থাকা (unaccompanied) আবাসিক বা অভিবাসী শিশুদের খুঁজে বের করে দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। রায়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিই একটি কল সেন্টার খুলতে যাচ্ছে যা ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে এবং এখানে বিশেষ একটি ইউনিট থাকবে যেটি “একা শিশু অভিবাসীদের অবস্থান নির্ণয় ও তথ্য সংগ্রহ” করবে—স্টেট ও স্থানীয় পুলিশের সহায়তায়। এই ইউনিট দিনের পর দিন ৬০০০-৭০০০ ফোনকল হ্যান্ডেল করবে বলা হয়েছে, যেখানে অভিবাসী শিশুদের বিষয়ে অভিভাবক-রহিত অবস্থান, ভর্তুকি তথ্য বা মুক্তিপ্রাপ্ত পরবর্তী অবস্থা রিপোর্ট করা হবে।
6 Nov 2025 | Pic: Collected
এটি এমন প্রেক্ষাপটে যে, আইসিই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অভিবাসী শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও উৎখাত করার এক দফা চালু করেছে, যেখানে তারা একক প্রবেশ করা শিশুদের বা অভিভাবক ছাড়াই অবস্থান করা শিশুদের প্রথমে “উড়ালযাত্রার ঝুঁকি” বা “সাধারণ নিরাপত্তার হুমকি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষ করে একটি গার্ডিয়ান বলছে, এই নীতিতে এরপর অভিবাসী-শিশুদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ১৪ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য এক-বারের আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে—যেমন ২,৫০০ ডলারের অফার।
আইসিইর নতুন উদ্যোগে দুইটি মূল দৃষ্টিভঙ্গা দেখা যাচ্ছে: প্রথমত, অভিবাসী শিশুদের বিরুদ্ধে তথ্যাভাস ও নজরদারি বৃদ্ধি; দ্বিতীয়ত, দ্রুত অবস্থা খতিয়ে দেখে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি করা। রায়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেট ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে তথ্য-ভিত্তিক সমন্বয় বাড়াতে একটি চুক্তি ধরা পড়েছে, যাতে অভিবাসী শিশুর অবস্থান শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে পাঠানো হবে।
এই উদ্যোগ নিয়ে অভিবাসন বিষয়ক অধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই উদ্বেগ ব্যক্ত করেছে। গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “শিশুদের নিরাপত্তার দেখতে আমরা বলছি- কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যাচ্ছে শিশুদের উপর চাপ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা নিজেদের আইনগত অধিকার ছাড়াই দ্রুত দেশছাড়া হয়ে যায়।” অভিযুক্তদের বাড়ছে- আইনজীবীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা সাময়িক আশ্রয়-প্রত্যাশায় এসেছে, নিজের বা পরিবারের জন্য আইনগত দাবিতে আছে, কিন্তু নতুন উদ্যোগ তাদের দ্রুত ফিরিয়ে পাঠাতে চাচ্ছে—এতে আইনগত থাকে না পর্যাপ্ত-পর্যায়ে পর্যালোচনা।
আইসিই বলেছে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য “নিরাপত্তা ও মানবপাচার রোধ”। তাদের মতে, একা থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে কখনও কখনও ট্রাফিকিং বা দাসপ্রথার ঝুঁকি থাকে, তাই তারা গতানুগতিক রাজ্যে-প্রকাশিত ক্যাম্পেইন থেকে একটু এগিয়ে যেতে চাইছে।তবে বিশ্লেষক ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন- এই ধরনের উদ্যোগ হলে ছোট বা অসহায় শিশুরা বৈধ অভ্যন্তরীণ আদালত-প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে, যা তাদের ওপর নতুন যন্ত্রণা তৈরি করবে।
এই নীতির কারণে ইতিমধ্যেই কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিউইয়র্ক-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ১৬, ১৭ বছরের একা শিশুদের রুটিন চেক-ইনয সময় দ্রুত আটক করা হয়েছে। এবিএস নিউজের প্রতিবেদনে একটি উদাহরণ আছে যেখানে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী, যিনি স্পেশাল ইমিগ্রান্ট জুবাইল স্ট্যাটাস (SIJS) পেয়েছিলেন, রুটিন চেক-ইনে গেলেই আটক হয়েছেন।
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই নীতিটি শুধু অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নয়, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারীদের জন্যও একটি বার্তা দিচ্ছে। সরকারি ব্যয়বহুল বন্দিশালার পরিমাণ ও নিরীক্ষার চাপ কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে; আইসিইর অধীন নির্যাতন-অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।নতুন এই উদ্যোগ থেকে বোঝা যায় যে, তারা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, এখন একা শিশুদেরও বেধে রাখার বা ফিরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করছে।
বাংলাদেশ ও ভারতীয় অভিবাসীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ খবর হতে পারে কারণ একা শিশু অভিবাসীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র-হিমায়েতকারী পরিবেশে তারা অপেক্ষাকৃত বেশি নমনীয়তার ওপর নির্ভরশীল হয়। যদিও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অভিবাসী শিশুদের একটি বড় অংশ মধ্য আমেরিকা থেকে আসে, তবু নীতি-বদলে প্রায়শই ভিন্ন দেশের শিশুরাও প্রভাবিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, অভিবাসী শিশুদের পরিবার, আইনজীবী এবং শরণার্থী সহায়তা সংস্থাগুলোকে এখন সতর্ক হতে হবে—যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর দিতে বলা হয়, বা দ্রুত ফিরে যাওয়ার জন্য অনুদানের প্রস্তাব আসে, তাহলে আইনজীবীর সঙ্গে কথা না ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তার থেকে বড় প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগের ফলে শিশুদের শান্ত অবস্থায় আইনগত আশ্রয় বা শরণার্থীর অধিকার রক্ষা কতটা সম্ভব হবে?
সবশেষে বলা যেতে পারে, আইসিইর এই নতুন উদ্যোগ মার্কিন অভিবাসন নীতিতে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করতে যাচ্ছে। যদিও উদ্দেশ্য নিরাপত্তাও হতে পারে, তবু এটা শিশুদের অধিকার, পরিবারের পুনর্মিলন ও দাস-পাচার রোধ সংক্রান্ত মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তরও চায়। আগামী সময় দেখাবে—এই নীতি বাস্তবে কেমনভাবে প্রয়োগ হয়, শিশুরা কতটা সুরক্ষিত হয় এবং সামাজিক ও মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে কতটা গ্রহণযোগ্য বলা যায়।



