লস অ্যাঞ্জেলেসের ২৩ বছর বয়সী তরুণী ক্যারি লোপেজ আলভারাডো, যিনি জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক, গত জুনে এক ভয়াবহ ঘটনার শিকার হন যখন ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্টরা তাকে ভুলভাবে গ্রেপ্তার করে। মাত্র কয়েকদিন পরেই আলভারাডো একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন, কিন্তু তার মাতৃত্বের আনন্দ ম্লান হয়ে যায় আটক অবস্থায় পাওয়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে। সিবিএস নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আটককালে তাকে হাতকড়া পরিয়ে আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পেটে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়, ফলে তার শরীরে আঘাত ও কাটা দাগ পড়ে যায় এবং প্রসব বেদনায় ভুগতে থাকেন।

24 September 2025 | Pic: Collected
সন্তান জন্মের পর সরাসরি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হন তিনি। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, আলভারাডোর প্রেমিককেও আটক করে গুয়াতেমালায় নির্বাসিত করা হয়, ফলে তিনি নবজাতক কন্যাকে কোলে নেয়ার সুযোগই পাননি। আলভারাডোর ঘটনা একক কোনো ঘটনা নয়; তার মতো আরও সাতজন মার্কিন নাগরিক এবং একজন গ্রিন কার্ডধারী একইভাবে ভুলভাবে আটক হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, কেবল গায়ের রং ও শারীরিক চেহারা দেখে তাদের প্রোফাইল করা হয়, নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখানোর সুযোগও দেয়া হয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসের জুয়ান রিভাস নামের এক গ্রিন কার্ডধারী, যিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করছেন, অভিযোগ করেন যে ৪ জুলাই তাকে হোম ডিপো পার্কিং লটে আটক করা হয়।
বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে মারধর করা হয়, মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। একই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন মার্কিন নাগরিক ব্রায়ান গাভিডিয়া, যিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে গাড়ির ডিলারশিপ ব্যবসার মালিক। তিনি অভিযোগ করেন, ফেডারেল এজেন্টরা তার ফোন ও আসল পরিচয়পত্র নিয়ে নেয় এবং দেয়ালে ঠেলে তার হাত মুচড়ে ফেলে। পরে তার বন্ধু ভিডিও ধারণ শুরু করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। হতাশ হয়ে গাভিডিয়া বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ভোট দেয়ার জন্য অনুতপ্ত। আলভারাডো ও অন্যান্যদের এসব অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকদের ওপর ফেডারেল ইমিগ্রেশন নীতির কঠোরতার এক জ্বলন্ত উদাহরণ, যা বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন-বিরোধী অবস্থানের সময় আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তের কারণে এমন পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে, যেখানে বৈধ নাগরিকরাও জিজ্ঞাসাবাদ বা ভুল আটক হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ অভিযোগগুলো নিয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অভিবাসন নীতির এই বিতর্ক কেবল প্রবাসীদের জন্য নয়, মার্কিন নাগরিকদের জন্যও নতুন এক শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। আলভারাডো বলেন, একজন মার্কিন নাগরিক হয়েও তাকে মেক্সিকান ভেবে প্রশ্ন করা হয়েছে, যা শুধু বৈষম্যমূলক নয়, মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন। শিশু জন্মদানের মতো সংবেদনশীল সময়ে তাকে শিকল পরানো, হাতকড়া দেয়া এবং অপমানজনক আচরণের কারণে এখনো তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভুগছেন। অভিবাসন নীতির নামে নাগরিকদের এভাবে আটক ও নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের ভুল আটক গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মৌলিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অনেক নাগরিক বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে তবে এর ফল মারাত্মক হতে পারে। এই ঘটনা একদিকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরদার করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে ভাবাচ্ছে – শুধু গায়ের রঙ বা ভাষার কারণে কি কোনো নাগরিককে বারবার প্রমাণ করতে হবে যে তিনি আসলেই আমেরিকান?




