১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই প্রাণবন্ত বিতর্কে তিনজন প্রধান প্রার্থী—অ্যান্ড্রু ক্যুমো, জোহরান মামদানি ও কার্টিস স্লিওয়া—মঞ্চে মুখোমুখি হন। দুই ঘণ্টাব্যাপী তর্ক-বিতর্কে শহরের জীবনযাত্রার ব্যয়, জননিরাপত্তা, শিক্ষা, বাসস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, এবং ইসরায়েল-গাজা সংঘাতসহ নানা ইস্যু নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। প্রতিটি বিষয়ে মামদানির যুক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দর্শকদের মন জয় করে নেয়। বিতর্কের পর অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, মামদানি এখনো সাবেক গভর্নর ক্যুমোর চেয়ে স্পষ্টভাবে এগিয়ে আছেন। জরিপে দেখা গেছে, মামদানির জনপ্রিয়তা তরুণ ভোটার এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে, ক্যুমো অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন। তৃতীয় অবস্থানে আছেন কার্টিস স্লিওয়া, যিনি বিতর্কে শহরের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দিলেও ব্যাপক সাড়া পাননি।

22 Oct 2025 | Pic: Collected
বিতর্ক শেষে তিনজনই নিজেকে বিজয়ী দাবি করেন, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় মামদানিকেই অধিকাংশ দর্শক ‘বাস্তব বিজয়ী’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। এনবিসি ৪ নিউইয়র্ক এবং ডাব্লিউএনবিসি কর্তৃক আয়োজিত এই বিতর্ক ছিল প্রার্থীদের জন্য নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। মামদানি বলেন, “নিউইয়র্ক এমন এক শহর, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদ, শিক্ষিত এবং সাশ্রয়ী জীবনের সুযোগ পাওয়ার অধিকার রাখে। আমি সেই শহর গড়তে চাই, যেখানে মানুষের কণ্ঠই হবে শক্তি।” ক্যুমো তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং সংকটকালীন নেতৃত্বের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, “আমি জানি কিভাবে নিউইয়র্ককে আবার উন্নয়নের পথে ফিরিয়ে আনা যায়।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্যুমোর বক্তব্য কিছুটা রক্ষণশীল এবং পুরনো প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও তরুণ ভোটারদের কাছে তা প্রভাব ফেলতে পারেনি। অন্যদিকে মামদানি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং জনগণের বাস্তব সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মামদানির জনপ্রিয়তা ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে ক্যুমো ৩৯ শতাংশে এবং স্লিওয়া মাত্র ১৫ শতাংশে অবস্থান করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানির শক্তিশালী বক্তব্য, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি এবং প্রবাসীদের প্রতি আন্তরিক মনোভাব তাকে নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। এনওয়াইইউ-র রাজনৈতিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হেনরি বেনসন মন্তব্য করেছেন, “মামদানি এমন এক সময় সামনে এসেছেন যখন নিউইয়র্ক শহর নতুন নেতৃত্বের খোঁজ করছে। তার ভিশন ও তৃণমূল সংযোগই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।” দ্বিতীয় বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে ২২ অক্টোবর, যেখানে আরও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্কের ফলাফল ভোটারদের মনোভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উল্লেখযোগ্য যে, মামদানি ইতিমধ্যেই নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন। তার কাজের মূল ফোকাস ছিল সাশ্রয়ী আবাসন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, এবং নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকারের পক্ষে আইন প্রণয়ন।
এই কারণে তিনি শুধু অভিবাসী নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে, ক্যুমো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনীতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং মহামারি চলাকালে নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে জনসমর্থন হারিয়েছেন। তিনি নিজের প্রতিরক্ষায় বলেন, “আমি ভুল স্বীকার করেছি, কিন্তু নিউইয়র্ককে পুনর্গঠনের জন্য এখনো আমার অভিজ্ঞতার দরকার।” তবে জনগণের বড় অংশ মনে করছেন, শহরকে পরিবর্তন করার জন্য নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন, এবং সেই নেতৃত্বের প্রতীক এখন মামদানি। রাজনৈতিকভাবে মামদানি ‘প্রগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাট’ ধারার প্রতিনিধি, যিনি সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা সংস্কার এবং করপোরেট জবাবদিহিতা নিয়ে সরব। তার প্রচারণার মূলমন্ত্র—“A City for Everyone”—ইতিমধ্যেই তরুণ ও কর্মজীবী ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয় স্লোগান হয়ে উঠেছে। তিনি শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনার পাশাপাশি জনগণের কণ্ঠস্বরকে প্রশাসনের মূলধারায় নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি মামদানি এই গতি ধরে রাখতে পারেন, তাহলে তিনি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র হতে পারেন।




