নিউ ইয়র্ক সিটির নতুন নির্বাচিত মেয়র জোরান মামদানি আনুষ্ঠানিকভাবে তার ৪০০ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিশন টিম ঘোষণা করেছেন, যেখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ও উপদলগুলোতে যুক্ত হয়েছেন মোট দশজন আমেরিকান বাংলাদেশি, যা বাংলাভাষী অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য এক বড় সম্মান। নির্বাচনের ২০ দিন পর সোমবার সকালে ঘোষণা করা এই দলটি নিউ ইয়র্ক সিটির ভবিষ্যৎ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণ, সংস্কার পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, পরিবহন উন্নয়ন, প্রযুক্তি সুবিধা সম্প্রসারণ, অভিবাসী সেবা ও অর্থনৈতিক বিকাশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের সুপারিশ তৈরি করবে। ঘোষণায় জানানো হয়, এই ট্রানজিশন টিমে যুক্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন অ্যাসাল-এর ন্যাশনাল সেক্রেটারি করিম চৌধুরী, ড্রামস বিটের পরিচালক কাজী ফৌজিয়া এবং কিউনি স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক ও ফরহাদ মযহারের কন্যা চুমতলি হক—যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ওয়ার্কার জাস্টিস কমিটিতে, যেখানে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে সুপারিশ তৈরির কাজ করা হবে।

25 Nov 2025 | Pic: Collected
এছাড়া রাইজ আপ নিউ ইয়র্ক সিটির প্রেসিডেন্ট শামসুল হককে কমিউনিটি সেফটি কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে, যা স্থানীয় নিরাপত্তা, কমিউনিটি পুলিশিং, অপরাধ প্রতিরোধ, যুব নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন ‘ভালো’ ও মাসভোটের শাহরিয়ার রহমান, সঙ্গে মুনার-এর আরমান চৌধুরী এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড ইসলামিক সেন্টারের ইমরান পাশাকে স্মল বিজনেস কমিটিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ছোট ব্যবসা শক্তিশালী করা, অভিবাসী উদ্যোক্তাদের সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসার লাইসেন্স ও অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে নীতি সুপারিশ তৈরি হবে।
অন্যদিকে হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের আব্দুল আজিজ ভুইয়াকে কমিটি অব কমিউনিটি অর্গানাইজিং-এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেখানে কমিউনিটি ক্ষমতায়ন, স্থানীয় অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হবে। একইভাবে তাজিন আজাদকে কমিটি অব ইয়ুথ অ্যান্ড এডুকেশনে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে স্কুল পরিবেশ, শিক্ষা সুযোগ, যুব উন্নয়ন, নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ এবং অসাম্য দূরীকরণ নিয়ে নীতি তৈরি করা হবে। এছাড়া সিএএএবি’র ফারিহান আক্তারকে নিযুক্ত করা হয়েছে কমিটি অব ইমিগ্র্যান্টস জাস্টিস-এ, যেখানে অভিবাসী সুরক্ষা, আইনি সহায়তা, ভাষা সহায়তা, বৈষম্য প্রতিরোধ এবং অভিবাসী অধিকার উন্নয়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে সুপারিশ উপস্থাপন করবেন তারা।
এই সব বাংলাদেশি সদস্যরা ট্রানজিশন টিমের মোট ১৭টি কার্যকরী কমিটির অধীনে দায়িত্ব পালন করবেন, যার মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবহন, কমিউনিটি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অভিবাসন নীতি, প্রযুক্তি সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ, স্থানীয় সেবা সংস্কার, সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ পরিকল্পনা, শ্রমিক অধিকার সুরক্ষা, ইত্যাদি সরকারি কার্যক্রমের নানা ক্ষেত্র। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ট্রানজিশন দলে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয়েছে ‘ওয়ার্কার জাস্টিস অ্যান্ড কমিউনিটি অর্গানাইজিং কমিটি’, যা নিউ ইয়র্ক সিটির কোনো মেয়রের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন সংযোজন এবং যেখানে তিনজন বাংলাদেশি সদস্য দায়িত্ব পেয়েছেন, যা অভিবাসী সমাজে শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিষয়গুলোকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনার সুযোগ করে দেবে।
মেয়র-ইলেক্ট জোরান মামদানি বলেন, নিউ ইয়র্ক সিটির নতুন দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার টিমের সব সদস্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এবং বিভিন্ন অভিবাসী কমিউনিটির অংশগ্রহণ তার প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মানুষ তার প্রশাসনে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা শহরের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনে মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা কতটা প্রবল তা নির্দেশ করে। তিনি বলেন, প্রতিটি কমিটির সদস্যরা শহরের জনগণের মতামত, প্রয়োজন এবং স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত নীতি তৈরি করবেন, যাতে নিউ ইয়র্ক সিটি আরও নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক, সাশ্রয়ী, ব্যবসাবান্ধব, অভিবাসী বান্ধব এবং প্রযুক্তি-উন্নত শহর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, এই ঘোষণা দেশের মানুষদের স্বীকৃতি, কষ্টার্জিত অবস্থান এবং নেতৃত্ব দক্ষতার প্রতিফলন। তারা আশা করছেন, ভবিষ্যতেও নিউ ইয়র্ক সিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে বাংলাদেশিরা আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে, এবং এই নিয়োগগুলো অভিবাসী সমাজে আরও অংশগ্রহণ বাড়াবে। নিউ ইয়র্কের সামাজিক সংগঠনগুলো মনে করছে, মামদানির প্রশাসনে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি শহরের নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে, বিশেষ করে শ্রম অধিকার, অভিবাসী সেবা, নিরাপত্তা এবং ছোট ব্যবসা কেন্দ্রিক নীতিগুলোতে। সার্বিকভাবে দেখা যায়, মামদানির ট্রানজিশন টিমে বাংলাদেশিদের এই উপস্থিতি অভিবাসী কমিউনিটির জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন এবং নিউ ইয়র্ক সিটির ভবিষ্যৎ উন্নয়নে নতুন অধ্যায়ের সূচনা।




