মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্রতিকূলতার মুখে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হিসেবে দেখতে হবে — এমন অনন্য মন্তব্য করেছেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নয়া বিতর্ক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এসেছে ঠিক তখন, যখন তিনি আর্কটিক অঞ্চল এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ রাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে একজন “বিশেষ দূত” নিয়োগ করেছেন, যাতে এই দ্বীপটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও গভীরভাবে পেঁচিয়ে নেওয়া যায়। ট্রাম্প একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে একথা জানিয়েছেন, তিনি মনে করেন গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং প্রতিকূল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য, বিশেষত রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে। ট্রাম্প বলেন, “আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য, এটি কেবল খনিজ সম্পদের জন্য নয়” এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে “এটি পেতে হবে” — এমন দৃঢ় ভাষায় মন্তব্য করেন, বিশেষ করে যখন তিনি বলেন হাই সমুদ্র পথ, আকাশসীমা এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা প্রতিকূলতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

23 Dec 2025 | Pic: Collected
ট্রাম্পের মতে, গ্রীনল্যান্ডে রাশিয়া ও চীনের সমুদ্রজাহাজ ও সামরিক গতিবিধি দেখা যাচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নিরাপত্তা হুমকি হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এই দ্বীপটির ওপর উচ্চস্তরের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ থাকা মানে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সুবিধা পাওয়া। তিনি বলেন, গ্রীনল্যান্ড খুব বড় কোন জনসংখ্যার দেশ নয়, কিন্তু এর ভূগোল ও অবস্থান এমন কিছু দেয় যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পেছনে স্থানীয় সামরিক ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত দলগুলো এই দ্বীপটিকে একটি মহাসাগরীয় নিরাপত্তা চাবিকাঠি হিসেবেও দেখছে, যেখানে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো — বিশেষ করে রাশিয়া ও চীন — রেখাঙ্কিত প্রতিকূল পরিবেশের জন্য তাঁদের অস্তিত্ব রেখে চলেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো যখন প্রকাশিত হয়, তখন তার আগে তিনি লুইজিয়ানার রিপাবলিকান গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে গ্রিনল্যান্ডের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করেন, যারা নিজেও গ্রীনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে মতামত পোষণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে সেখানে শক্ত অবস্থান নিতে চান এমন একটি দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, ল্যান্ড্রি নিজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাম্পের এই দায়িত্ব নেওয়া সম্পর্কে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন এবং বলেছেন তিনি এই ভূমিকা সম্পাদনে উৎসাহী থাকবেন, যদিও এটি তাঁর গভর্নর পদেও কোন প্রভাব ফেলবে না বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে ট্রাম্পের এই দাবিতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ তীব্র প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন করেছে, যেখানে তারা পরিষ্কারভাবে বলেছে যে গ্রীনল্যান্ড “গ্রিনল্যান্ডের মানুষই ঠিক করবেন এর ভবিষ্যৎ, এবং এটি অন্য দেশের অংশ হবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত তারা নিতে চায় না”। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে তাঁর দেশ এবং গ্রীনল্যান্ডের সরকার “স্থানীয় জনগণের সার্বভৌম অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত এবং অন্য দেশকে এমনভাবে দাবি করার মতো কোন অধিকার নেই”। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝাতে বলেছেন যে গ্রীনল্যান্ড “নিজেদের” এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে, এবং তারা তাদের ভূখণ্ডের ওপর নিজের সার্বভৌম অধিকারের বিরোধিতা করতে পারে না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্যে কেবল কৌশলগত নিরাপত্তা‑ভিত্তিক দাবিই নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি শক্তি প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন এবং ন্যাটোর মতো অভিজাত নিরাপত্তা সংঘগুলো নিজেদের কৌশলগত অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে। গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান আর্কটিক মহাসাগরের দিকে এমন একটি জায়গায় যেখানে সমস্ত বিশ্বশক্তির নজর রয়েছে এবং রাশিয়া ও চীনের নৌ ও সামরিক ব্যবস্থা এখানে তাদের সুবিধা নিতে চাচ্ছে বলে মার্কিন প্রশাসনের আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, এমন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য এই দ্বীপটির ভূমিকা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, ট্রাম্প এই দাবির সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের খনিজ ও দুর্লভ উপাদান‑সম্পদ বিষয়টিকে সরাসরি প্রথম পর্যায়ে উল্লেখ না করেও বলেছেন যে *জাতীয় নিরাপত্তা’ই এখানে মূল ঘোর বিপদ ও সুবিধার বিষয়। তিনি বলেন, “এটি খনিজ সম্পদের জন্য নয়… আমাদের নিরাপত্তার জন্য এটি লাগবে।” এর ফলে ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের রণনীতিতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কৌশলকে বেশি চাপ দেওয়া হচ্ছে, এবং গ্রীনল্যান্ডকে কেবল বিজনেস বা সম্পদ হিসেবেই দেখেন না, বরং এটিকে একটি ভূ‑রাজনৈতিক দক্ষতা কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাইছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া এসেছে, যেখানে কিছু বিশ্লেষক বলছেন যে এটি একটি নতুন ধরণের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের সম্পর্ককে কৌশলগত সুবিধা ও বিরোধের মধ্যে টানতে পারে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এবং গ্রীনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী উভয়ই বলেন যে গ্রীনল্যান্ড “অন্য দেশগুলোর অংশ নয়”, এবং তারা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌম অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিৎ।
এ ধরনের মন্তব্যের পরেও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই ধরণের নীতি এবং কৌশলগত অবস্থানের পক্ষে একটি যুক্তি হচ্ছে যে, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রসারের কারণে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র যদি এগিয়ে না আসে এবং সেই অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে ঘিরে না ধরে রাখে, তাহলে এটি তার নিরাপত্তা সংগ্রামে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এই প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বৈঠক ও কূটনৈতিক আলোচনা আরও তীব্র হবে, এবং ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আলোচনায় বসবেন যাতে আন্তর্জাতিক আইন, নেতৃত্ব ও সার্বভৌম অধিকারের বিষয়গুলো সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা যায়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও ভূ‑রাজনৈতিক কৌশল সংশ্লিষ্ট একটি বৃহৎ বিতর্কের সূচনা হতে পারে, যেখানে ন্যাটো বন্ধুত্ব, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৃহত্তর বিশ্বের কৌশলগত ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা তীব্র হবে।




