২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর সময় প্রকাশিত ফলাফলে সঙ্কলিত ভোট ও গণনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে Zohran Mamdani-কে (৩৪) তিনি শুধু এখনো নির্বাচন জিতে ইতিহাস রচনা করছেন তাই নয়, পরবর্তী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে তিনি হবেন নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র, প্রথম দক্ষিণ-এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র এবং এক শতাব্দীরও বেশিবারের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী মেয়রও। উল্লেখযোগ্য যে, তিনি শুধু এই একক ‘প্রথম’ নয়, বরং এক-একটি মাইলফলক ছুঁয়ে যাচ্ছেন — মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে এক নতুন আশা ও দৃষ্টান্ত গড়ার দৃষ্টিতে এই জয়কে দেখা হচ্ছে।
মামদানির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল New York State Assembly-র ৩৬ নম্বর নির্বাচনী এলাকা (কুইন্স, অ্যাস্টোরিয়া) থেকে, যেখানে তিনি ২০২১ সাল থেকে সেবা দিচ্ছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন উগান্ডার ক্যাম্পালায়, ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক পরিবারে। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে কিছু সময় কাটান, এরপর যুক্তরাষ্ট্রে আসেন সাত বছর বয়সী হয়ে। তাঁর পরিবারে রয়েছে বিশিষ্ট পিতা-জি: পিতৃবর্গ Mahmood Mamdani (কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা) ও মাতৃবর্গ Mira Nair (প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার) — এটারই প্রতিফলন কিনা, এই রাজনৈতিক উঠানভোর ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিচয়।
5 Nov 2025 | Pic: Collected
এই নির্বাচনে মামদানির জয় শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষকরা এটিকে একটি ‘রাজপ্রতিষ্ঠিত’ পরিবর্তনের চিহ্ন বলছেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই রক্ষণশীল বা মধ্যমপন্থী ধারা নিউইয়র্কের রাজনীতিতে বলবৎ ছিল — কিন্তু মামদানির ক্যাম্পেইন ছিল নিচ থেকে শুরু, সামাজিক মাধ্যম ও গ্রাসরুটস সংঘটনের মাধ্যমে।তাঁর প্রচারের মূল বিষয় ছিল “নিউইয়র্ককে আরও সাশ্রয়ী, আরও ন্যায়সংগত ও সাধারণ মানুষ-মুখী নগরী হিসেবে গঠন” : যেমন বাস নিখরচায় চালু করার প্রস্তাব, রেন্ট স্থিতিশীল বাড়িগুলোর জন্য ভাড়ার凍結 (freeze) নিয়ন্ত্রণ, শহরের দারিদ্র্য ও বাসস্থান সংকট মোকাবিলা, ধনী ও করগ্রস্থদের ওপর বেশি কর আর নগর কর্তৃত্বাধীন গুদামকে প্রতিষ্ঠিত করার মত উদ্যোগ।
এমন সময় এই নির্বাচনী জয় এসেছে প্রচন্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও — প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন গভর্নর Andrew Cuomo এবং রেপাবলিকান প্রার্থী Curtis Sliwa। এই জয়কে বিশ্লেষকরা বলছেন শুধু নিউইয়র্কে নয়, সারা আমেরিকার রাজনীতিতে প্রগ্রেসিভ আন্দোলনের জন্য এক নতুন উদাহরণ।
এছাড়া, মামদানির মুসলিম পরিচয় এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায়, তিনি একদিকে মুসলিম এবং দক্ষিণ এশীয়-আমেরিকান সম্প্রদায়ের জন্য একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থানে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কম ছিল — তাই এই জয়কে অনেকেই দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনৈতিক উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে। তবে, এই ইসলামোফোবিয়া ও বিভাজন-ভিত্তিক বিরোধ ছাড়াই নয় — নির্বাচনের সময় মামদানির বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধী ও বর্ণবিদ্বেষমূলক আক্রমণও ধেয়ে আসে।
নিউইয়র্ক সিটি-র ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, এত হঠাৎ পরিবর্তন খুব-বেশি হয় না — শহরটির মেয়রগুলোর মধ্যে মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় বা এমন কম বয়সীদের আগে ছিল না। তাই এই মুহূর্তটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
জোহরান মামদানির নির্ধারিত অভিষেক হবে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে, যেখানে তিনি হবেন শহরের ১১১তম মেয়র। শহরটির নতুন আলোচনায় তিনি রয়েছেন “তরুণ, বহুসাংস্কৃতিক ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব” হিসেবে — যা অনেক মার্কিন নগরীর জন্য এক উদাহরণ হতে পারে।
এই জয় শুধু তাঁর জন্য নয়, নিউইয়র্কের নিম্নআয়ের পরিবার, অভিবাসী সম্প্রদায়, মুসলিম-দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্যও জানিয়েছেন এক নতুন সম্ভাবনার বার্তা: অ্যাস্টোরিয়া থেকে শুরু করে ব্রঙ্কস-কুইন্সের সড়কঘাটায় যারা অনেকে বলতেন “আমাদের জন্য হইবে না”, আজ সেই বার্তা পাল্টেছে।
শহরের সামনে রয়েছে বড় দায়িত্ব: বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তন, দারিদ্র্যের সাথে লড়াই, সামাজিক একতা বাড়ানো — আর সেখানেই মামদানির প্রতিশ্রুতি তাঁর পরিচয় দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর নেতৃত্ব কি সত্যিই এই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে পারবে, সেটাই সময় বলবে।



