যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রাজ্য সম্প্রতি ইতিহাস গড়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত মানবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেটা দীর্ঘ দিনের আইনি ও নৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সেখানে গভর্নর ক্যাথি হোকুল স্বীকার করেছেন যে মরণাপন্ন রোগীদের কাছে চিকিৎসকের সহায়তায় তাদের জীবন নিজের ইচ্ছায় শেষ করার সুযোগ প্রদানের বিষয়ে একটি আইন অনুমোদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা এখন থেকে বৈধ হতে যাচ্ছে এবং এটি শুধু নিউ ইয়র্ক নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এই সিদ্ধান্ত কেবল আঞ্চলিক একটি আইন নয় বরং অন্ত্যেষ্টি যত্ন, মানুষের মানসিক ও শারীরিক অমুকমের ক্ষতিপূরণ এবং জীবনশেষ স্বীকৃতি সম্পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক তর্কের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে। অন্তর্বর্তী ঘটনাবলি, আইনের কাঠামো, সমর্থন‑সমালোচনা এবং সম্ভাব্য সামাজিক‑নৈতিক প্রভাব নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

18 Dec 2025 | Pic: Collected
নিউ ইয়র্কে গৃহীত এই আইন অনুসারে, **যে কোনো গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি যের উপর চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন যে তাঁর মৃত্যু আগামী ৬ মাসের মধ্যে হতে পারে, সে চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুনাশক ঔষধ গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবে, এবং আবেদনটি যদি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও একজন পরামর্শদাতা চিকিৎসক অনুমোদন করেন, তখন রোগী এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে। আবেদনটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক হতে হবে এবং রোগীর উপর কোনো চাপ দেওয়া হচ্ছেনা তা নিশ্চিত করার জন্য দুইজন প্রত্যক্ষদর্শীর স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক, এবং রোগী স্থিতিশীল অবস্থায় আবেদন করে কি না তা একজন মনোবিদের দ্বারা যাচাই করা হবে। এছাড়া আবেদন গ্রহণের পর অন্তত পাঁচদিন অপেক্ষা করার মৌলিক শর্তও আইনে রাখা হয়েছে এবং লিখিত ও মৌখিক নির্দিষ্ট রেকর্ড রাখা হবে, যাতে চাইলে পরে যেকোনো সময় আবেদন প্রত্যাহার করা যায়। ধর্মীয় সংগঠনগুলো, যেমন ক্যাথলিক উপাসনালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে এই আইন কার্যকরিতায় অংশগ্রহণ না করতেও পারে, এই সুযোগ রাখা হয়েছে। সর্বশেষ গৃহীত এই আইনের কার্যকারিতা শুধুমাত্র নিউ ইয়র্ক স্টেটের বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য হবে এবং বহিরাগতরা এর আওতায় আসবে না।
গভর্নর ক্যাথি হোকুল এই আইনের পক্ষে ন্যায্যতা তুলে ধরতে বলেন, তিনি বহু মরণাপন্ন নিউ ইয়র্কবাসীর এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে দুঃখ, যন্ত্রণাকাতর জীবন ও নিরাশার গল্প শুনেছেন, এবং এই অনুভূতির ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে যারা নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, তাদের কাছে এটি একটি দয়াশীল ও মানবিক বিকল্প হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, “ঈশ্বর দয়ালু এবং আমাদেরও এমন হতে হবে — এর মধ্যে তাদেরও অন্তর্ভুক্ত যারা পরিস্থিতির স্বীকার এবং জীবনের শেষ কয়েক মাসে শান্তি খুঁজছেন।” এই ভাষাগত উপস্থাপনা দেখায় যে, আইনটি কেবল শাসনিক উদ্যোগ নয় বরং একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে রোগীর দুঃখ ও যন্ত্রণা কমানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে রাখা হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনাও এসেছে, বিশেষত ধর্মীয় ও নৈতিক নেতাদের তরফ থেকে। নিউ ইয়র্কের ক্যাথলিক কনফারেন্সের ধর্মযাজক কার্ডিনাল তিমোথি দোলান ও অন্যান্য খ্রিষ্টান নেতা এই আইনকে তীব্রভাবে নিন্দা করেছেন এবং দাবি করেছেন, কেউ অক্ষম বা অসুস্থ বলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, এই আইনের মাধ্যমে সরকার একটি দুর্বল ও অসহায় জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসকদের ভূমিকা হেনস্তা করছে এবং জীবনের মর্যাদা নষ্ট করছে। তাঁরা মনে করেন, চিকিৎসকের মৌলিক ভূমিকা হলো রোগীকে জীবনযাপন ও চিকিৎসা পরিচালনা করে সুস্থতা ও জীবনের মান উন্নয়ন করা, এবং আইনটি তা থেকে সরে গিয়ে মানবিক ও নৈতিক দিকগুলোকে ক্ষুণ্ন করছে।
আইনের এই বৈধতা বাস্তবায়নের আগে নিউ ইয়র্ক রাজ্যে ২০১৬ সালে একই বিষয়টি প্রায় আলোচনায় আসে, কিন্তু তখন ক্যাথলিক সংগঠনগুলোসহ বিভিন্ন প্রতিকূল শক্তির চাপের কারণে এটি কার্যকর হয়নি। কিন্তু কয়েক বছর পেরিয়ে এবং রাজনৈতিক‑সামাজিক পরিস্থিতি বদলানোর পর, নতুন করে এই আইনের সমর্থনে গৃহীত চুক্তি ও শর্তগুলো প্রায় গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং নতুন কাঠামোতে রাজ্য সরকার এটিকে আইন হিসেবে চালু করতে যাচ্ছেন, যার মধ্যে সুরক্ষা‑নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মনঃপরীক্ষা, সাক্ষর ও অপেক্ষা‑সময়ের মতো শর্তগুলো রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে মরণাপন্ন রোগীদের স্বেচ্ছা মৃত্যু বা চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যু (যা অনেক দেশে medical aid in dying বা euthanasia‑এর ন্যারো ব্যবহার হিসেবেও ডাকা হয়) নিয়ে নিয়মিত বিতর্ক ও আইনগত চিন্তা চলছে, যেমন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও ইলিনয় রাজ্যে এমনই আইন পাশ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যেখানে terminal illness‑এর ক্ষেত্রে রোগীরা নিজ নিজ জীবনের শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বিশেষ শর্ত অনুযায়ী। এই আইনের পক্ষে যুক্তি হলো এটি মানবিক ও দয়াশীল একটি বিকল্প, যেখানে একজন রোগী তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পারে, কিন্তু বিপক্ষে আছে যারা মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে জীবনের মর্যাদাকে রক্ষা করা জরুরি বলে মনে করেন।
নিউ ইয়র্কের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে কারণ এটি চিকিৎসা, আইন, নৈতিকতা ও মানবাধিকারের সঙ্কটপূর্ণ এক প্রেক্ষাপটকে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে রাষ্ট্র ও রাজ্য‑স্তরের সরকারকে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সামাজিক‑নৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হচ্ছে. স্বেচ্ছা মৃত্যু নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে চিকিৎসক, রোগী, পরিবার ও সমাজ—সবাইকে ভাবতে হবে কিভাবে একজন মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে সম্মান, স্বাধীনতা ও সহানুভূতিশীল সহায়তা দেওয়া যায়, পাশাপাশি জীবনের মর্যাদা রক্ষা করা যায়।




