যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ–এর গভর্নর লিসা কুক–কে সরাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আবেদন করেছিলেন, তা ওয়াশিংটন ডিসির আপিল আদালত সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে কুকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ “মর্টগেজ প্রতারণা” প্রমাণিত নয় এবং তিনি যখন ফেডের দায়িত্বে ছিলেন না, তখনকার ঘটনার ভিত্তিতে তাঁকে বরখাস্ত করা যাবে না। ফলে কুক এখন নিরাপদে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এবং আসন্ন সুদের হার নির্ধারণ বৈঠকে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। আদালতের এই রায় শুধু লিসার ব্যক্তিগত জয়ের বিষয় নয়, বরং এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার বড় পদক্ষেপ। কারণ, ফেড রিজার্ভের স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল ভিত্তি, যেখানে প্রেসিডেন্ট বা রাজনৈতিক চাপ কোনোভাবে সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে না।

16 September 2025 | Pic: Collected
ট্রাম্প তাঁর আবেদনে অভিযোগ করেছিলেন যে লিসা কুক ২০২১ সালে দুইটি বাড়ি কেনার সময় “primary residence” হিসেবে ভুলভাবে দাবি করেছিলেন, যা মর্টগেজ প্রতারণার আওতায় পড়ে। যদিও তিনি নিজে এর দায় অস্বীকার করেন এবং বলেন এটি ছিল একটি ভুল বোঝাবুঝি। আদালত পর্যালোচনা করে দেখে, ঘটনাগুলো কুক যখন ফেডে যোগ দেন তার আগের, তাই এগুলো “for cause” ধারা অনুযায়ী বরখাস্তের কারণ হতে পারে না। ফেড গভর্নরদের সরাতে হলে গুরুতর অনিয়ম বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা প্রমাণ করতে হয়। ফলে আদালত মনে করে ট্রাম্পের আবেদন আইনি ভিত্তিহীন।
এই রায়ের মাধ্যমে লিসা কুকের ফেড গভর্নর হিসেবে অবস্থান আরও শক্ত হলো। কুক ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মনোনয়নে বোর্ডে যোগ দেন এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তিনি অর্থনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অধ্যাপক এবং গবেষক। তাঁর কাজের ক্ষেত্র প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য। আদালতের এই রায় তাঁর ক্যারিয়ারে এক বড় আইনি জয়ের পাশাপাশি বৈষম্যের শিকার নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় ফেডের স্বাধীনতা আরও সুসংহত হলো। যদি আদালত ট্রাম্পের পক্ষে রায় দিত, তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টরা রাজনৈতিক কারণে ফেড গভর্নরদের সরানোর চেষ্টা করতে পারতেন। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতো, যা অর্থনীতি ও বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করতে পারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেডের মূল কাজ হলো মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান স্থিতিশীল রাখা। রাজনৈতিক চাপ এলে এই ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকত।
লিসা কুককে কেন্দ্র করে এই মামলা এখন রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় দাবি করছেন যে ফেড “ভুল নীতি” নিচ্ছে, যা আমেরিকার অর্থনীতি ধ্বংস করছে। তিনি বারবার সুদের হার কমানোর জন্য চাপ দিয়েছেন। তবে আদালতের এই রায় ট্রাম্পকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ফেড গভর্নরদের বিরুদ্ধে সরাসরি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আইনি ভিত্তি ছাড়া সম্ভব নয়। এর ফলে ট্রাম্পের সমালোচনা বেড়েছে, কারণ অনেকে বলছেন তিনি অর্থনীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাতে চাইছেন।
এদিকে, হোয়াইট হাউস এবং ডেমোক্র্যাট নেতারা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীন থাকলেই অর্থনীতি সঠিক পথে চলবে। বাইডেন প্রশাসনও জানায়, কুক ফেড বোর্ডে দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত এবং তাঁর অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে আসবে। অনেক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন, এই রায় মার্কিন সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চাপ থেকে রক্ষা করার প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে।
এখনো অবশ্য মামলা পুরোপুরি শেষ হয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, ট্রাম্প চাইলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে নিতে পারেন। তবে বর্তমান রায়ের ফলে লিসা কুক নিরাপদে বোর্ডে থেকে আগামী বৈঠকে যুক্ত হবেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফেড সুদের হার কমানো বা অপরিবর্তিত রাখার মতো বড় সিদ্ধান্ত নেবে শিগগিরই, আর সেই প্রেক্ষাপটে লিসার অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, এই রায় যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি প্রমাণ করেছে, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এখনো শক্তভাবে কাজ করছে। লিসা কুকের এই জয় ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষার পাশাপাশি বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে মার্কিন অর্থনীতি এখনো রাজনীতির বাইরে থেকে পরিচালিত হচ্ছে।




