যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সম্প্রতি এক বিতর্কিত মন্তব্যে দাবি করেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেল আসলে “যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ”, এবং ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের জাতীয়করণকে “মার্কিন সম্পদের সবচেয়ে বড় চুরি” হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং কারাকাস-ওয়াশিংটন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উত্তেজিত করেছে। বরাবরের মতো এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন, ভূ-রাজনীতি ও তেলশিল্প ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

18 Dec 2025 | Pic: Collected
স্টিফেন মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে লিখেছেন যে “মার্কিনদের শ্রম, মেধা ও উদ্যোগ দিয়েই ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প গড়ে ওঠে” এবং ১৯৭০ ও ২০০০ দশকে ভেনেজুয়েলার জনগণ এবং সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলোর থেকে এই শিল্প নেয়ায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেল ও অন্যান্য সম্পদ “চুরি” করেছে, মন্তব্য করে এটিকে ইতিহাসের অন্যতম বড় সম্পদচুরি বলে অভিহিত করেছেন।
মিলারের এই মন্তব্যের সাথে যুক্ত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অবস্থান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করেছে। ট্রাম্প নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে তিনি ভেনেজুয়েলার তেল, জমি ও অন্যান্য সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত দিতে চাইছেন, এবং দেশটিকে সম্ভাব্যভাবে *মার্কিন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পের জাতীয়করণ ১৯৭৬ সালে শুরু হয়েছিলো যখন দেশটি তার তেল সম্পদকে পিডিভিএসএ (PDVSA) নামে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির অধীনে এনেছিল এবং ২০০৭ সালে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ সমস্ত বিদেশি অংশীদার কোম্পানিগুলোকেও পরিচালনার বাইরে রেখে দেন। এরপর কনোকোফিলিপস ও এক্সন মোবিলসহ মার্কিন তেল জায়ান্টগুলো কোয়া থেকে বের হয়ে যায়, এবং এরপর বহু কোম্পানি দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েছে পিডিভিএসএ-এর শোষণের বিরুদ্ধে।
এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মাদক পাচার ও “সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক”-এর অভিযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছে যে দেশটির তেলের রাজস্ব সন্ত্রাস, মাদক পাচার ও উপনিবেশিক কার্যক্রমকে অর্থ প্রদান করতে ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং সেই কারণেই তেল শোষণের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিষ্কাশন করছে।
ভেনেজুয়েলার সহস্র কোটি ব্যারেল তেল ভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে সংকটের মধ্যে পড়ে আছে, এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে তেল রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবাহে ক্ষতি ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল ট্যাংকারগুলোকে অবরোধের নির্দেশ দিয়েছে এবং সেই সাথে ভেনেজুয়েলার ওপর সামরিক উপস্থিতি ও কূটনৈতিক চাপ জোরদার করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য ওঠানামা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
কারাকাস তীব্রভাবে এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনভঙ্গ ও সম্পদ চুরির চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দাবি করেছেন যে তাঁর দেশটি তার তেল সম্পদ ও সার্বভৌম অধিকারে পুরোপুরি অধিকার রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণমূলক হস্তক্ষেপ।
এই উত্তেজনার মাঝেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ক্যারিবীয় অঞ্চলে বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর সৈন্য মোতায়েন এবং সামরিক সরঞ্জাম স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবিকে জোরদার করছে, যা লাতিন আমেরিকায় স্থিতিশীলতার উপর গভীর প্রভাব ফেলছে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ইস্যুটি কেবল একটি তেল সম্পদের মালিকানা বা অর্থনৈতিক দাবির বাইরে গিয়ে ভূ-রাজনৈতিক শক্তি প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক আইন, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শক্তি বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি জটিল প্রতীক, এবং এর ফল বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, এবং বহু দেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।




