মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের এবং ব্যাপক। বর্তমানে এই অঞ্চলের ১২টিরও বেশি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ৪০ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মী মোতায়েন আছেন। শুধু স্থলেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী মোতায়েন রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

Source: BBC Bangla | 24 June 2025 | Pic: Collected
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলিতে মার্কিন হামলার পর এসব ঘাঁটিগুলো ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল যে তারা “সমস্ত বিকল্প খোলা রাখবে” পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য। এই উত্তেজনার মধ্যে গত জুন মাসে কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়, যদিও কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নতুন নয়। ইরাক যুদ্ধের সময় এই অঞ্চলে মার্কিন সেনার সংখ্যা ছিল এক লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি, আফগানিস্তান যুদ্ধেও ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইসরায়েল-ইরানের উত্তেজনা এবং ইয়েমেনের হুথিদের হামলার জেরে এই উপস্থিতি আরও জোরদার করা হয়। তবে, ইরানের বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র কিছু ঘাঁটি থেকে সামরিক বাহিনী স্বেচ্ছায় কমিয়ে নিয়েছে, যাতে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
মধ্যপ্রাচ্যে কমপক্ষে ১৯টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সৌদি আরব, বাহরাইন, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার ও সিরিয়ায় অবস্থিত ঘাঁটিগুলোকে স্থায়ী হিসেবে বিবেচনা করেন। এছাড়া, জিবুতি ও তুরস্কের ঘাঁটিও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কাতার: বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটি
কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি। এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং বিমান বাহিনীর ফরওয়ার্ড হেডকোয়ার্টার হিসেবে কাজ করে। ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানে এটি মূল কেন্দ্র ছিল। প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা এখানে মোতায়েন রয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানে বেশ কিছু যুদ্ধবিমান সরিয়ে নেওয়া হয়।
বাহরাইন: মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর
বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দফতর অবস্থিত, যা পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে দায়িত্ব পালন করে। প্রায় ৯ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন এই ছোট্ট দ্বীপে। এখানে সুপারক্যারিয়ারসহ বিভিন্ন নৌযান মোতায়েন রয়েছে।
কুয়েত: গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল ও লজিস্টিক্যাল হাব
কুয়েতে মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটিগুলোর মধ্যে ক্যাম্প আরিফজান ও আলী আল-সালেম বিমান ঘাঁটি রয়েছে। ক্যাম্প আরিফজান হল সেন্টকমের অপারেশনাল ও লজিস্টিকাল কেন্দ্র, যেখানে প্রচুর সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি মজুদ রয়েছে। এখানে প্রায় ১৩,৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সিরিয়া
ইউএইয়ের আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি একটি কৌশলগত ঘাঁটি যা গোয়েন্দা ও যুদ্ধ বিমান অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি মূলত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য, যদিও সম্প্রতি তাদের ঘাঁটিগুলো কমিয়ে আনার ঘোষণা এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কেবল সামরিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও একটি হাতিয়ার। এই ঘাঁটিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও কখনো কখনো উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ এবং ইয়েমেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক নজর ও আলোচনা বাড়ছে।




