যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট শিকাগো শহরে ন্যাশনাল গার্ড সেনা মোতায়েনের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একটি বড় আইনি দাবিকে আপাতত থামিয়ে দিয়েছে, যার ফলে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা স্থগিত রয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী নীতির একটি বিতর্কিত উপাদান বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) আদালতের স্বাক্ষরবিহীন আদেশে নিম্ন আদালতের দেওয়া নিষেধাজ্ঞাটি বহাল রাখা হয়, যা শিকাগোতে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের মোতায়েনের ওপর আইনগত বাধা সৃষ্টি করে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে বলা হয়েছে যে সরকার এখনও এমন আইনি ক্ষমতার উৎস প্রমাণ করতে পারে নি, যেটি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়, এবং এর ফলে আপাতত সেনা মোতায়েন বন্ধ রয়েছে।
24 Dec 2025 | Pic: Collected
ট্রাম্প প্রশাসন এই মোতায়েনকে “ফেডারেল কর্মী ও সম্পত্তি রক্ষার” একটি জোরালো প্রয়াস বলে উপস্থাপন করেছিল, আর এই উদ্দেশ্যে নিজস্ব অভিবাসন নীতি ও আইনশৃঙ্খলা উদ্যোগে সহায়তা হিসাবে ন্যাশনাল গার্ডকে সেনা হিসেবে মোতায়েন করার চেষ্টা চালিয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি ছিল যে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত অভিবাসন ও শুল্ক কার্যকর (ICE) কেন্দ্রগুলোর সামনে হতাশায় অনাবশ্যক হিংসার ঘটনা ঘটছে, এবং ফেডারেল কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে, তাই সামরিক বাহিনীর সাহায্য প্রয়োজন। এর আগে ২০২৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস, ওয়াশিংটন ডিসি ও মেমফিসে এমন মোতায়েনের চেষ্টা ছিল, কিন্তু পোর্টল্যান্ড ও শিকাগোসহ কিছু ক্ষেত্রে আদালত তা স্থগিত করেছিল।
সুপ্রীম কোর্টের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট-নেতৃত্বাধীন ইলিনয় অঙ্গরাজ্য ও শিকাগো শহরের নেতৃত্ব স্বাগত জানিয়েছে। ইলিনয় গভর্নর জেবি প্রিটজকার একথা বলেছেন যে এই রায় “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় একটি বড় জয়”। তিনি বলেন, স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দক্ষ ভূমিকা পালন করছে, এবং অতিরিক্ত সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন নেই।
আবার হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন এই রায়ের পর মন্তব্য করেন যে সরকারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য — ফেডারেল কর্মী ও সম্পত্তি নিরাপত্তা প্রদানে — আপাতত বদলায়নি, এবং প্রশাসন আইনগত বিকল্প ও অন্যান্য উপায় খুঁজছে যাতে এটা নিশ্চিত করা যায় যে সন্ধানাধীন পরিস্থিতিতে ফেডারেল কর্মকর্তারা নিরাপদে কাজ করতে পারেন। তিনি জানান, সেনাবাহিনী মোতায়েনের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও প্রশাসন নিরাপত্তা নীতিগুলো বজায় রাখবে।
সুপ্রিম কোর্টের আদেশটি শুধু শিকাগো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি অন্যান্য নগরীর আইনি লড়াইগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন পোর্টল্যান্ড, ওরেগন, ওয়াশিংটন ডিসি, ক্যালিফোর্নিয়া ও অন্যান্য শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আদেশও ইতোমধ্যেই আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে আছে এবং সুপ্রিম কোর্টের এই রায় সেই মামলাগুলোর পরিণতির ধারায় নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে।
আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন যে এই রায় রাষ্ট্রীয় ও ফেডারেল ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা—এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইনের মূল ভিত্তির প্রতিফলন। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে বলা হয়েছে যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা “Posse Comitatus Act” বা দাসত্ব দমন আইন অনুযায়ী সীমাবদ্ধ, যেখানে সামরিক বাহিনী সাধারণ জনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবহার করা যায় না যদি না প্রেসিডেন্ট প্রমাণ করতে পারে যে আইন প্রয়োগ করার জন্য সাধারণ বাহিনী অক্ষম বা গণবিপ্লবের মতো পরিস্থিতি চলছে। ইতোমধ্যেই শিকাগো অঞ্চলে দ্রুততায় কোনো বিপ্লব বা বিদ্রোহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই আদালত সেনা মোতায়েনে অনুমোদন দেয়নি।
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্টের তিন রক্ষণশীল বিচারপতি — স্যামুয়েল আলিটো, ক্ল্যারেন্স থমাস ও নিল গরসাচ — মতভেদ করেছেন এবং প্রশাসনের পক্ষে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা দাবি করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা সংক্ষিপ্তভাষণে বলেছেন যে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব হলো ফেডারেল আইন কার্যকর করা এবং যে পরিস্থিতিতে ফেডারেল কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে, সেখানে সামরিক সহযোগিতা করা উচিত। যদিও তাদের মত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে পরিণত হয়নি, তিনজনের মতামত রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কে বিরোধিতার ইঙ্গিত বহন করে।
বিশ্বব্যাপী এই ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের নজর আকর্ষণ করেছে, কারণ এটি সেনা মোতায়েন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতির সীমা, নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষমতা সুষম করার প্রয়োজনীয়তা—এসব বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায় একটি বিরল প্রধান প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে প্রেসিডেন্টের উচ্চ ক্ষমতা দাবি ব্যাহত হয়েছে এবং বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় বোঝাপড়া ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই রায়ের মাধ্যমে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের উদ্যোগ আপাতত আটকে গেলেও প্রশাসনের অন্যান্য উপায় যাচাই করা হতে পারে এবং আদালতে আরও আইনগত লড়াই চলমান রয়েছে। এর ফলে আগামী মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার খোলামেলা বিতর্ক আরও প্রবল হতে পারে এবং পুরো দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি দলের মধ্যে এই বিষয়ের ওপর ব্যাপক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।



