উত্তর কোরিয়া, যে দেশে বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং গোপনীয়তা বজায় থাকে, সেখানে এবার ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে: প্রথমবারের মতো দেশটিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (EPL) সম্প্রচার করা হবে।
বিশ্বপ্রসিদ্ধ লিগটি উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা আগে কখনো দেখতে পায়নি — কারণ লাইভ সম্প্রচার ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু এবার কিম জং উনের নির্দেশে অন্তত পাঁচটি কঠোর শর্ত মেনে সম্প্রচারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

16 Nov 2025 | Pic: Collected
শর্তগুলো কি?
প্রথম শর্ত হলো লাইভ সম্প্রচার নয় — উত্তর কোরিয়ানরা খেলাগুলোর সরাসরি অ্যাকশন দেখতে পাবেন না; সেগুলো পুরোটাই দেরিতে এবং সম্পাদিত ভার্সনে দেখানো হবে।
দ্বিতীয়ত, সাধারণত ৯০ মিনিটের ম্যাচকে মাত্র ৬০ মিনিটে হ্রাস করা হবে। “অপ্রয়োজনীয়” বা “অনুচিত” অংশগুলো কেটে ফেলা হবে বলে জানানো হয়েছে।
তৃতীয় শর্ত হিসেবে, দক্ষিন কোরিয়ার খেলোয়াড়দের অংশ সরিয়ে ফেলা হবে—যেমন, ব্রেন্টফোর্ডের কিম জি-সু এবং উলভসের হোয়াং হি-চানকে দেখানো হবে না।
চতুর্থ শর্ত হলো ইংরেজি শব্দ এবং গ্রাফিক্স পরিবর্তন — স্টেডিয়াম, বিজ্ঞাপন বোর্ড, স্কোরবোর্ড, ব্যানার বা গ্রাফিক্সে থাকা ইংরেজি লেখা “কোরিয়ান ভাষায়” পরিবর্তন করা হবে অথবা মুছে ফেলা হবে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল শর্ত: LGBTQ প্রতীক বা রেইনবো ফ্ল্যাগ অন্তর্ভুক্ত যেকোনো দৃশ্য সেন্সর করা হবে এবং দেখা যাবে না।
সম্প্রচার কেমন হবে?
দ্য গার্ডিয়ান অনুসারে, প্রিমিয়ার লিগ সম্প্রচার “অননুমোদিত এবং ব্যাপকভাবে সম্পাদিত” হবে। ম্যাচগুলো আকারে ছোট করা হবে, গ্রাফিক্স পরিবর্তন ও ব্লার করা হবে, এবং ইংরেজি বিজ্ঞাপন, লোগো বা স্কোর বোর্ড বাদ দেওয়া হবে বা কোরিয়ান ভাষায় প্রতিস্থাপন করা হবে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রচার সময়: খবর অনুযায়ী, খেলা সম্প্রচার অনেক দেরিতে হবে — কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫০ দিন পর্যন্ত দেরি হতে পারে।
কেন এই শর্ত?
এই গোপনীয় সম্প্রচার নীতিমালা সম্ভবত দেশটির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণবিহীনতার অংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়দের উপস্থাপন বন্ধ করা এবং এলজিবিটিকিউ প্রতীক বাদ দেওয়া মূলত উত্তর কোরিয়ার সরকারের কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ এবং অনুমোদিত ভাবমূর্তিকরণ নীতি প্রতিফলিত করে।
এছাড়া, স্টেটে রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকরণের বাইরে সাময়িক “নিরপেক্ষ বিনোদন” হিসেবে ফুটবলকে দেখা হচ্ছে — এটা তাদের জন্য একমাত্র ব্যতিক্রমী সাময়িক গ্লোবাল বিষয়, যেখানে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার চাপে কিছু নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া উপভোগ করা যায়।
প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
অনেক বিশেষজ্ঞ দেখছেন এটিকে একটি চক্রবর্ধমান কৌশল হিসেবে — কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যেই সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত বিনোদন দেওয়া হচ্ছেঃ একদিকে জনগণকে কিছু দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে পুরো সম্প্রচার কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।
এই ঘটনা উত্তর কোরিয়ার জনমতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার একটি নতুন পথ হিসেবে দেখায়। এমনকি খেলাধুলাকে “নিরপেক্ষ” বিনোদন হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের প্রোপাগান্ডা পরিচালনায়ও এটি এক সুযোগ।
তবে এটা স্পষ্ট যে, সাধারণ নাগরিকদের প্রিমিয়ার লিগ দেখার অভিজ্ঞতা একটি সম্পূর্ণই “সংশোধিত সংস্করণ” হবে — যা তাদের বিশ্বব্যাপী ফুটবল সংস্কৃতির পুরো বিষয়টাই পুরোপুরি অনুধাবন করার সুযোগ দেবে না।
সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গা
- উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে বহির্বিশ্বের প্রভাব খুব সীমিত রাখে, কিন্তু এবার তারা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগকে নিয়ন্ত্রিতভাবে গ্রহণ করছে।
- এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে — স্টেট টেলিভিশনকে একটি দরজা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে “নিয়ন্ত্রিত বিনোদন” দেখাতে।
- সম্প্রচার শর্তগুলো (৯০ মিনিট → ৬০ মিনিট, গ্রাফিক্স সম্পাদনা, ভাষা পরিবর্তন, সেন্সরশিপ) শুধুমাত্র পারফর্মেন্সই ছুপিয়ে রাখছে না, বরং রাজনৈতিক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণও প্রতিফলিত করছে।
- অংশগ্রহণকারী দর্শকরা এমন এক সংস্করণ দেখবেন যা তাদেরকে “প্রিমিয়ার লিগ” অনুভূতি দেবে, কিন্তু আসল গ্লোবাল ফুটবল অভিজ্ঞতা পুরোপুরি দেওয়া হবে না।




