ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় টি‑টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, যেখানে প্রতিবার নিলাম (অকশন) তারকাদের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করে থাকে এবং এটি বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট ভক্তদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি বছর যখন আইপিএলের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রেমিরাও তাকিয়ে থাকেন তাদের আন্তর্জাতিক স্টারদের ওপর — বিশেষত বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা কত দামে বিক্রি হচ্ছেন এবং আইপিএলের ইতিহাসে কোন বাংলাদেশি খেলোয়াড় সবচেয়ে বেশি মূল্য পেয়েছেন — তা নিয়ে। সর্বশেষ ২০২৬ আইপিএল নিলামে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমান সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয়ে এই তালিকায় শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছেন, এবং এর আগে দুই তারকা বাংলাদেশি ক্রিকেটারও আইপিএলে উল্লেখযোগ্য দামে বিক্রি হয়ে দেশকে গর্বিত করেছে। এই তিনজন ক্রিকেটারের গল্প, বিক্রির মূল্য ও আইপিএলের প্রেক্ষাপটের বিশদ বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।

18 Dec 2025 | Pic: Collected
প্রথমে মোস্তাফিজুর রহমান‑এর নাম উঠে আসে কারণ তিনি এখন পর্যন্ত আইপিএল নিলামে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হওয়া বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ইতিহাস গড়ে দিয়েছেন। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত ২০২৬ আইপিএল নিলামে মোস্তাফিজ যার বেস প্রাইস শুরু হয়েছিল ২ কোটি রুপি থেকে, তাতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) তাকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা সমান। এই দামে বিক্রির মাধ্যমে মোস্তাফিজ আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে দামি বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে চূড়ায় অবস্থান করছে, এবং এটি গত ১৬ বছর ধরে বহমান রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমানের এই রেকর্ড শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয় — এটি তার ক্রিকেট যাত্রারও এক বড় সফলতার প্রতিফলন। তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর কাটার, ইয়র্কার এবং দ্রুত বোলিং দক্ষতার জন্য বিখ্যাত, এবং আইপিএলেও বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে খেলেছেন এবং ম্যাচ সিচুয়েশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এটি তাঁর অষ্টম সিজন টুর্নামেন্ট হিসেবে আরও একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি যেমন সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস ও চেন্নাই সুপার কিংস‑এর সঙ্গে মাঠে নামেছেন এবং বহু ক্রীড়াপ্রেমীর নজর আকর্ষণ করেছেন।
এর আগে মাশরাফি বিন মুর্তজা ছিলেন আইপিএলে সবচেয়ে দামি বাংলাদেশি ক্রিকেটারের রেকর্ড ধারক। ২০০৯ সালের আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্স তাকে ৬ লাখ মার্কিন ডলারে দলে নিয়েছিল, যা বর্তমান রুপি হিসেব করলে প্রায় ৫ কোটি ৪৫ লাখ রুপি (বাংলাদেশি প্রায় ৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা) সমান ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ড হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। মাশরাফির এই উদ্যোগ ক্রিকেট ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং সেই সময়কার আইপিএল‑এর বাজার মূল্য ও প্রতিযোগিতার প্রকৃতিকে তুলে ধরে।
তৃতীয় বাংলাদেশি যার নাম গুরুত্বসহকারে উঠে এসেছে, তিনি হলেন সাকিব আল হাসান, বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। ২০১৫ সালের আইপিএলে সাকিবকে ২ কোটি ৮০ লাখ রুপিতে কলকাতা নাইট রাইডার্স দলে নিয়েছিল, যা তাঁর সময়ের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য মূল্য ছিল এবং তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও দৃঢ় করে তুলেছিল। সাকিব দীর্ঘদিন আইপিএলে খেলেছেন এবং তাঁর ব্যাটিং ও বোলিং উভয় দিকেই বিপক্ষ দলের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে সক্ষম খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের আইপিএল নিলামে উচ্চমূল্যে বিক্রির পেছনে কেবল পারফরম্যান্সই নয়, বরং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, টিম ব্যালান্স ও ফ্র্যাঞ্চাইজির কৌশলগত প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় নেওয়া হয়। মোস্তাফিজুর মতো পেসারদের প্রতি বর্তমান সময়ের টুর্নামেন্টে বিশেষভাবে উচ্চ মূল্য দেওয়া হয় কারণ ডেথ ওভার বোলিং এবং সঠিক স্লোয়ার/কাটার টেকনিক টি‑টোয়েন্টি ক্রিকেটে দলের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ায়। একইভাবে, সাকিবের মতো অলরাউন্ডাররা দলকে ব্যাটিং ও বোলিং উভয় দিকেই সাহায্য করতে পারে, যা তাকে একটি আকর্ষণীয় আইপিএল ক্রয় করে তোলে।
এছাড়া, বিপুল মূল্য বিশিষ্ট এই বিক্রির ফলে বাংলাদেশি ক্রিকেটের গ্লোবাল মূল্যায়ন ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে আরও তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য আন্তর্জাতিক লিগগুলোতে সুযোগ সৃষ্টি করছে। আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক লীগ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায়, বাংলাদেশের ক্রিকেট পরিবেশে এটি একটি বড় অনুপ্রেরণা হিসেবেও কাজ করছে।
বর্তমানে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা আইপিএলে যে দামে বিক্রি হয়েছেন তা শুধু অর্থনৈতিক মূল্য নয়, তাদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্য ও টুর্নামেন্টের প্রতি প্রভাব—এসবের একটি সমন্বিত প্রতিফলন। মোস্তাফিজুর ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি মূল্যের চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের জন্য বড় সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে এবং এটি দেশীয় ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করবে।




