বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল আবারও চোটে পড়েছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছেন ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি। কিন্তু ক্লাব ও জাতীয় দলের মধ্যে টানাপোড়েন এখন তার ক্যারিয়ারের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ইয়ামাল সম্প্রতি স্পেন জাতীয় দলে নিয়মিত ডাক পাচ্ছেন, পাশাপাশি বার্সেলোনারও মূল একাদশের অপরিহার্য সদস্য হয়ে উঠেছেন। মাত্র কয়েক মাস আগেই তিনি রেকর্ড গড়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে গোল করেছিলেন, যা তাকে স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে কনিষ্ঠ গোলদাতা বানায়। তবে এত অল্প বয়সেই লাগাতার খেলা, ব্যস্ত সূচি আর বিশ্রামের অভাবে তার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

5 Oct 2025 | Pic: Collected
ক্লাব বার্সেলোনা শুরু থেকেই চেয়েছিল ইয়ামালকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে, কিন্তু স্পেন জাতীয় দলের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাকে নিয়মিত খেলাচ্ছেন, কারণ তিনি এই তরুণ উইঙ্গারকে দলের ভবিষ্যৎ ভরসা হিসেবে দেখছেন। এই দুই কোচের টানাপোড়েনই যেন ইয়ামালের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ লা লিগার ম্যাচে রিয়াল সোসিয়েদাদের বিপক্ষে তিনি খেলতে নামলেও প্রথমার্ধের শেষদিকে পেশিতে টান অনুভব করেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে নামেননি। পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার হ্যামস্ট্রিংয়ে হালকা টান পড়েছে। বার্সেলোনা ক্লাব চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ইয়ামালকে অন্তত দুই সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হতে পারে। ফলে তিনি স্পেনের আসন্ন নেশন্স লিগ ম্যাচেও খেলতে পারবেন না। এই চোট নতুন কিছু নয়—গত মৌসুমেও একই জায়গায় সমস্যা হয়েছিল তার। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র ১৭ বছরের এক কিশোরের ওপর এতটা চাপ দেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায়। বার্সেলোনার কোচ হ্যানসি ফ্লিকও বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাই না ইয়ামালকে অল্প বয়সেই নিঃশেষ করে দেওয়া হোক। তার জন্য সঠিক বিশ্রাম ও মেডিক্যাল ব্যবস্থাপনা জরুরি।” অন্যদিকে স্পেন দলের কোচ ফুয়েন্তে বলেছেন, “ইয়ামাল আমাদের ভবিষ্যতের সম্পদ। আমরা তার সঙ্গে সতর্কভাবে আচরণ করছি, তবে খেলোয়াড় নিজেও অনেক সময় খেলতে চায়, সেটিই সমস্যা তৈরি করে।” এই পরিস্থিতিতে বার্সেলোনা ও স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে মতবিরোধ আরও বেড়েছে। কারণ ক্লাব চায় তারকা খেলোয়াড়দের ইনজুরি এড়াতে আন্তর্জাতিক ম্যাচে সীমিত ব্যবহার হোক, কিন্তু ফেডারেশন জাতীয় দলের সাফল্যের স্বার্থে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ইতিমধ্যে ইয়ামালের ইনজুরিতে বার্সেলোনার সমর্থকরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে লিখেছেন, “এই ছেলেটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।” কেউ কেউ আবার সরাসরি স্পেন কোচকে দায়ী করেছেন। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে ইয়ামাল ৬৪টিরও বেশি ম্যাচে অংশ নিয়েছেন, যা একজন কিশোর খেলোয়াড়ের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার বয়সে এই পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম মাংসপেশির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
তাই তারা পরামর্শ দিয়েছেন অন্তত এক মাস বিশ্রামে থাকার। তবুও ইয়ামালের প্রতিশ্রুতি ও পরিশ্রমে সবাই মুগ্ধ। ইনজুরির পরও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, “আমি দ্রুত ফিরে আসব এবং আরও শক্তভাবে খেলব।” বর্তমানে তিনি বার্সেলোনার মেডিক্যাল টিমের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন, এবং রিহ্যাব প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ক্লাব জানিয়েছে, তারা তার দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ারকে অগ্রাধিকার দেবে, তাই কোনো ধরনের তাড়াহুড়ো করে মাঠে ফেরানো হবে না। ইউরোপের অন্যান্য বড় ক্লাব যেমন ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ ও পিএসজি তাদের তরুণ তারকাদের খেলানোর ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক থাকে, কিন্তু বার্সেলোনা ও স্পেনের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ইয়ামালের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা হয়তো ভবিষ্যতে ক্লাব ও ফেডারেশনের মধ্যে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করবে, যাতে তরুণ খেলোয়াড়দের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। সার্বিকভাবে বলা যায়, লামিন ইয়ামাল ইউরোপের সবচেয়ে বড় প্রতিভা হলেও তার ক্যারিয়ার এখন একটি বড় পরীক্ষার সামনে। যদি দুই পক্ষই সময়মতো সমন্বয় করতে না পারে, তবে এই প্রতিভার আগুন নিভে যেতে সময় লাগবে না। তাই ফুটবলপ্রেমীরা এখন একটাই আশা করছেন—ইয়ামাল যেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরে আসেন এবং তার প্রতিভা দিয়ে আবারও মুগ্ধ করেন ফুটবল বিশ্বকে।



