ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম শক্তিধর ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি-র মালিক প্রতিষ্ঠান সিটি ফুটবল গ্রুপ (City Football Group — CFG) ভারতের ঘরোয়া ফুটবল ক্লাব মুম্বাই সিটি FC থেকে সকল বিনিয়োগ ও মালিকানা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে একটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে CFG মুম্বাই সিটি-র ৬৫ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করেছিল এবং সেই সময়ে এটি ভারতীয় ফুটবলে একটি বিপ্লবাত্মক বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়েছিল, যা ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের আন্তর্জাতিক মান ও পরিসরকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে নেয়া হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার মধ্যে মুম্বাই সিটি-তে দুবার আইএসএল লিগ শিল্ড ও দুবার আইএসএল কাপ জয়ও ছিল, আর মনে করা হয়েছিল CFG-এর অংশীদারিত্ব দেশের ফুটবল উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় CFG তাদের সম্পূর্ণ মালিকানা পুরনো মালিকদের কাছে ফেরত দিচ্ছে — যেখানে বলিউড অভিনেতা রণবীর কাপুর ও ব্যবসায়ী বিমল পারেখ আবার পুরো মালিক হয়ে যাচ্ছেন। CFG-এর এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL)-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা ও অব্যাহত প্রশাসনিক জটিলতা দেখানো হয়েছে।
আইএসএল-এর ২০২৫-২৬ মৌসুমের শুরুতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা মূলত ফেডারেশন ও বাণিজ্যিক অংশীদারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া ও বিতর্ক নিয়ে — যার কারণে আইএসএল অচলাবস্থা তে পড়েছে এবং নতুন মৌসুম নির্ধারিত সময়ে শুরু হচ্ছে না। ফলে CFG-এর মতো একটি গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া কঠিন মনে করছে এবং তারা আর এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক নয়।
সিটির এই অংশীদারিত্বের সময়ে মুম্বাই সিটি আইএসএল-এ একটি অন্যতম সফল দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তাদের অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- দুবার আইএসএল লিগ শিল্ড জয় — লিগ পর্যায়ে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া সম্মান।
- দুবার আইএসএল কাপ জয় — খেলা অবস্থান থেকে পরের ধাপে সাফল্য।
- দলটি নিয়মিত শীর্ষস্থানীয় দল হিসেবে প্রতিযোগিতা করেছে এবং আইএসএল-এ নতুন ধারণা, স্ট্রাকচার ও প্রশিক্ষণ নীতি এনেছে।
তবে মাঠে সাফল্যের পাশাপাশি অবকাঠামো, প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও লিগ-পরিচালনা-তে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা CFG-এর মত বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
আইএসএল-এর চলমান অচলাবস্থা নিয়ে বেশ কয়েকটি সংকটজনক বিষয় সামনে এসেছে:
- চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া — এআইএফএফ ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে চুক্তির মেয়াদ ও নবায়ন নিয়ে সমস্যা হয়েছে, যার জন্য লিগের সূচি স্থির করা যাচ্ছে না।
- বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা — অনেক বিদেশি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও লাভজনকতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছে।
- খেলোয়াড় ও ক্লাব ব্যবস্থাপনা — অবিরত ঝড়—ঝঞ্ঝাটে ক্লাবগুলোও কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হিমশিম খাচ্ছে।
- ফেডারেশনের ভূমিকা — এআইএফএফ-এর যোগাযোগ ও পরিচালনা স্তরের অপ্রতুলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই পরিস্থিতি ভারতীয় ঘরোয়া ফুটবল ও আন্তর্জাতিক সংযুক্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ CFG-এর মত একটি বড় গ্লোবাল খেলা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সমর্থন না দিলে আইএসএল-এর উন্নয়ন ধীর হয়ে যেতে পারে।
বিশ্ব ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন CFG-এর এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র মুম্বাই সিটির বিনিয়োগ প্রত্যাহার নয়, বরং আইএসএল-এর আন্তর্জাতিক আকর্ষণ ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত স্থিতিশীল ও লাভজনক লিগ কাঠামোতে বিনিয়োগ করতে চান, কিন্তু অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়ানো স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
এদিকে ভারতীয় ফুটবল সমর্থকরা এর প্রতিক্রিয়ায় মুম্বাই সিটির স্থায়ী ভারতীয় মালিকানায় ফেরার সিদ্ধান্তে অনেকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করছেন, কারণ স্থানীয় ঐতিহ্যগত মালিকানা ফুটবল উন্নয়নের জন্য নতুন প্রেরণা জোগাতে পারে। তবে অনেকেই আইএসএল-এর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা শীর্ষে তুলে ধরছেন।



