বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এবার তাঁকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে পোর্তুগিজ লিগ। গত বুধবার পোর্তো শহরে লিগা পর্তুগাল গালায় এই ঘোষণা দেওয়া হয়, যা শুধু তাঁর ক্যারিয়ারের জন্য নয়, পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের জন্যও এক গর্বের মুহূর্ত। পুরস্কার গ্রহণের সময় আবেগঘন বক্তব্যে রোনালদো বলেন, “এই পুরস্কার দেওয়ার জন্য লিগা পর্তুগালকে ধন্যবাদ। আমাকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে—এটি আমার দেশের জন্য বিশাল সম্মানের।” তিনি আরও বলেন, “আমার সতীর্থ, কোচ, পরিবার ও সমর্থকরা আমার ক্যারিয়ারজুড়ে পাশে ছিলেন।

12 September 2025 | Pic: Collected
তাঁদের ছাড়া আজকের এই স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব হতো না।” রোনালদোর দীর্ঘ ক্যারিয়ার ফুটবল বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মাঠে রাজত্ব করছেন তিনি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করলেও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনি নিজের কিংবদন্তি রূপটি পূর্ণ করেন। সেখানে নয় মৌসুমে গড়ে তোলেন অসংখ্য রেকর্ড, করেন ৪৫০টির বেশি গোল, জেতেন একের পর এক শিরোপা। পরে জুভেন্টাসে খেলতে গিয়ে ইতালিয়ান ফুটবলেও নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন। বর্তমানে সৌদি আরবের আল নাসরের জার্সি গায়ে খেললেও তাঁর গোল করার ক্ষুধা এক বিন্দুও কমেনি। আশ্চর্যজনকভাবে ৪০ বছর বয়সেও রোনালদোর ফিটনেস এবং পারফরম্যান্স তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। শুধু ক্লাব নয়, জাতীয় দল পর্তুগালের হয়েও তিনি গড়েছেন রেকর্ড।
ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশনস লিগ জিতে দিয়েছেন দেশকে। জাতীয় দলের হয়ে করেছেন সর্বাধিক গোল, যেটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে একটি নতুন মানদণ্ড। বর্তমানে তিনি ১০০০তম গোলের পথে হাঁটছেন—ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই মাইলফলকের খুব কাছাকাছি তিনি। বর্তমানে তাঁর গোল সংখ্যা ৯৪৩, মাত্র ৫৭ গোল দূরে আছেন স্বপ্নের সংখ্যাটি থেকে। এর মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস ও আল নাসরের হয়ে আলাদা আলাদা করে শতাধিক গোল করেছেন, যা ইতিহাসে কোনো খেলোয়াড়ের নেই। পাঁচবার ব্যালন ডি’অর, চারবার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট, অসংখ্য লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি তাঁর ক্যারিয়ারের অর্জনের মুকুটে যোগ করেছে অসংখ্য পালক। সমালোচকেরা বলেন, লিওনেল মেসি ও রোনালদোর মধ্যে কে সেরা তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এই বিশেষ স্বীকৃতি রোনালদোর প্রতি ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও পরিষ্কার করল—তিনি শুধু সমসাময়িক সেরা নন, বরং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ।
রোনালদোর জীবনগল্পও অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা। ছোট দ্বীপ মাদেইরার সাধারণ এক পরিবারের সন্তান থেকে বিশ্বসেরা ফুটবলার হওয়া তাঁর যাত্রা সহজ ছিল না। শৈশবের দারিদ্র্য, সংগ্রাম, অনুশাসন ও ত্যাগ তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা কঠোর অনুশীলন, ফিটনেসে অটল মনোযোগ, মানসিক দৃঢ়তা তাঁকে সবার থেকে আলাদা করেছে। তাঁর সাফল্য শুধু ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক কাজেও তিনি নিয়মিত যুক্ত। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থায় বড় অঙ্কের অর্থ দান করেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করেছেন। মাঠের বাইরেও তাই তিনি এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। রোনালদো বলেন, তিনি এখনও খেলার প্রতি তীব্র আগ্রহ বোধ করেন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত খেলার স্বপ্ন দেখেন। যদি তিনি বিশ্বকাপে খেলতে নামেন, তবে এটি হবে তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ উপস্থিতি, যা আবারও ইতিহাস গড়বে। ফুটবলের অনুরাগীরা বিশ্বাস করেন, রোনালদো মাঠে থাকলে বয়স কোনো বাধা নয়; তিনি গোল করবেন, দলকে জেতাবেন এবং দর্শকদের আনন্দ দেবেন। এই সম্মান তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের উপযুক্ত স্বীকৃতি, যা ফুটবলপ্রেমীদের মনে তাঁকে চিরদিনের জন্য অমর করে রাখল।




