বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১‑এর প্রসিকিউশন পক্ষ গত ৭ ডিসেম্বর আদালতে দাবি করেছে যে গুম‑নির্যাতনের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন সাবেক প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক; এই অভিযোগ শুনানি শুরু হয়েছে, এবং আদালত ইতিমধ্যে তিন সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে হাজির করেছে।প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনাকারী চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, মামলায় গঠিত অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল) বা আয়নাঘর এবং গোপন তল্লাশিচালিত কারাগারগুলোতে গুম, নৃশংস নির্যাতন ও হত্যা সংঘটিত হয়েছে; এবং এসব ঘটনা ছিল “কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও নির্দেশনার” অংশ।
৭ ডিসেম্বর দুপুরে, বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন তিন-সদস্য বিশিষ্ট ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ অভিযোগ গঠন শুনানিতে বসে; অন্যান্য বিচারক ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ইতিমধ্যে ৩ জন সাবেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে — তারা হলেন মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী।
অভিযুক্তদের মধ্যে পলাতক রয়েছেন সাবেক প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক, এবং আরও কয়েক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৩০ জন। প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে গঠন করেছে কয়েক ধরনের গুরুতর অভিযোগ গুম, গোপন বন্দি, নির্যাতন, হত্যাসহ “মানবতাবিরোধী অপরাধ”।
তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যেই গোপন জেলখানা, গুম হওয়া ব্যক্তির তালিকা, মৃতদেহ, নির্যাতন‑দুর্দশা ও শংখাপত্র সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে; প্রাথমিক শুনানায় আদালত রাষ্ট্রকে নির্দেশ দিয়েছে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের জন্য।
এই মামলা শুধু ইতিহাস নয় এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার, ন্যায়ের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রীয় দায়‑দায়িত্বের দিকে জনমতের দৃষ্টিকোণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা রাখে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সবার উপরে যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে দেশবাসীর জন্য আইন ও স্বচ্ছতার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। অন্যদিকে, এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ এবং শুনানি এমন এক সময় এসেছে যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত।
বর্তমানে শুনানি চলছে; ট্রাইব্যুনাল আগামী ৯ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় ও পলাতক আসামিদের ডিফেন্স অংশের শুনানি নির্ধারণ করেছে। জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো নজর রাখছে যে এই বিচার কখন, কীভাবে হবে এবং সত্যিই কি ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই মামলার প্রেক্ষিতে, দেশের সামনে প্রশ্ন উঠছে গুম, শক্তি‑অব্যবহার, গোপন কারাগার এবং নির্যাতন: কোথায় ছিল রাষ্ট্রের চারপাশের নিয়ন্ত্রণ? যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের দায় কি পুরোপুরি স্বীকৃতি পাবে? আর ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কেমন আইন, স্বচ্ছতা ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলা হবে?
যদি ট্রাইব্যুনাল‑র প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ থাকে, এবং পলাতকদের বিচারের আওতায় আনা যায় তাহলে এই মামলা হবে বাংলাদেশের জন্য ন্যায়ের এক বড় দৃষ্টান্ত। অন্যথায়, এর ফলাফল দেশের বিচার ও মানবাধিকার ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।



