দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলের নীতি নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর এবারই প্রথম সরাসরি নির্বাচনের লড়াইয়ে নামছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুরোনো আসন বগুড়া-৬ (সদর) থেকে। এই আসনটি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এখান থেকেই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল।
4 Nov 2025 | Pic: Collected
সোমবার (৩ নভেম্বর) গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৩৭টি আসনের প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করেন। সেই তালিকায় বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয় তারেক রহমানের নাম। এর আগে তিনি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এবার নির্বাচনে অংশ নেবেন। গত অক্টোবর মাসে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “জি, ইনশাআল্লাহ, এবার আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি।”
বগুড়াকে বিএনপির “রাজনৈতিক জন্মভূমি” বলা হয়। এখানকার জনগণ সবসময়ই ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি অনুগত। ১৯৯১ সাল থেকে খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ বা বগুড়া-৭ আসনের অন্তত একটি থেকে প্রার্থী হয়ে এসেছেন এবং কখনো পরাজিত হননি। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এমনকি ২০০৮ সালের উপনির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।
২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বয়কট করায় এই আসনে কোনো প্রার্থী দেননি তারা। পরে ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া দণ্ডিত থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, তখন বগুড়া-৬ আসনে প্রার্থী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি জয়ী হলেও সংসদে শপথ নেননি। তার পদত্যাগের পর উপনির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে জয় পান গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ।
২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি অংশ নেয়নি। তবে এবার দলের ভিতরে প্রস্তুতি ও সংগঠন পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। তারেক রহমানের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণকে বিএনপির জন্য একটি “রাজনৈতিক মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১১ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বগুড়ার সাতটি আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে যুক্ত হন তারেক রহমান। তখন থেকেই গুঞ্জন ছিল—বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে “জিয়া পরিবার” থেকে প্রার্থী হতে পারেন কেউ। শেষ পর্যন্ত সেটিই সত্যি হলো। জানা গেছে, বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তারেক রহমান, আর বগুড়া-৭ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন খালেদা জিয়া নিজে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত বিএনপির নেতৃত্বে নতুন মাত্রা যোগ করবে। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করলেও তিনি দলের নীতি নির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সক্রিয় ছিলেন। এখন মাঠে নেমে তার জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতা প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
বগুড়া শহরে ইতিমধ্যে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। স্থানীয়ভাবে “তারেক ভাই আসছে” শ্লোগানে পোস্টার ও ব্যানার টানানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীও এই আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়বেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই আসনে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ভোটার রয়েছেন। তাদের মধ্যে যুব ভোটারদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, তারেক রহমান যদি প্রচারণায় অংশ নিতে পারেন বা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তবে তার জন্য ব্যাপক সহানুভূতি তৈরি হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, বগুড়া-৬ আসনের নির্বাচন শুধু একটি আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এটি বিএনপির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রতীক হয়ে দাঁড়াতে পারে।



