সাম্প্রতিক গুম কমিশনের দ্বিতীয় প্রতিবেদনে জানা গেছে—বাংলাদেশ ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সীমান্ত পার হয়ে অবৈধভাবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের আদান-প্রদানে লিপ্ত ছিল। ৪ জুন গুম কমিশনের এই প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের চাহিদা এবং স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের অবৈধভাবে একদিকে “গুম” করে অন্যদিকে আদান-প্রদান করা হতো।

Source: Ittefaq | 24 June 2025 | Pic: Collected
এই কর্মকাণ্ডকে কমিশন “আন্তঃরাষ্ট্রীয় গুমপ্রক্রিয়া” হিসেবে অভিহিত করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অনেক নাগরিককে গুম করে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানো হতো এবং বিপরীতে ভারত থেকেও অনেককে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হতো। কোনো আদালতের অনুমতি বা নথিভুক্ত মামলার ভিত্তি ছাড়াই এই পুরো প্রক্রিয়া অবৈধভাবে পরিচালিত হতো, যার ফলে ব্যক্তির অধিকার ও মানবাধিকার ভয়ানকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছিল।
নির্যাতন ও নিখোঁজের ধরণ
প্রতিবেদনে অন্তত পাঁচজন গুম হওয়া ভুক্তভোগী ব্যক্তির সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগই, ভারতের কাছে পাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এক নজরে দেখা গেল, সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি প্রথমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন, তারপর বাংলাদেশের ডিজিএফআই (DGF) ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে প্রস্তাব পাঠিয়ে আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো।
আবার, অন্য একজন বন্দীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যিনি বলেন, “আমাকে চোখ বেঁধে ভারতের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আবার বাংলাদেশে নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমাকে বলে দেওয়া হয়, ‘তুমি মরো, তুমি বাঁচো, আমরা ঠিক করব’।” আরেক বন্দীকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাঠিয়ে সেখানে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে ভিডিও কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তার পর তিনি ফেরত এনে র্যাব (RAB) এর হেফাজতে রাখা হয়।
বৈধতার অভাব ও আইনি প্রতিরক্ষা প্রশ্ন
গুম কমিশনের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ রয়েছে, যে — এসব কর্মকাণ্ডে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে মৌখিক সমঝোতা থাকলেও কোনো লিখিত চুক্তি বা আইনি কাঠামো নেই। এ কারণে, এই প্রক্রিয়ায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে, পরিবারগুলো কোনোভাবে জানতে পারে না বা প্রমাণ অর্জনে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এই অবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কারণ এতে ব্যক্তির স্বাধীনতা, আইনি নিরাপত্তা ও বিচারপ্রাপ্তির অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও প্রভাব
গুমের প্রক্রিয়া শুধু সীমানা অতিক্রমের সমস্যা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সমন্বয় যা মানবাধিকার, আইনি ন্যায় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকেও জাগিয়ে তোলে। প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশ থেকে ভারত এবং ভারত থেকে বাংলাদেশে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের আদান-প্রদানে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শুধুমাত্র গোয়েন্দা সংস্থার স্বার্থ প্রাধান্য পায়—যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ।
এছাড়াও, এই প্রক্রিয়ায় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা থাকেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে না জানানো, না দেখা পাওয়া—এগুলি সবই মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
গুম কমিশনের এই প্রতিবেদন একদিকে স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা এক মৌখিক সমঝোতার ভিত্তিতে অবৈধভাবে ব্যক্তিদের গুম করে আদান-প্রদান করতেন। অন্যদিকে, এ ব্যাপারে যথাযথ আইনগত কাঠামো ও নথি সংরক্ষণের অভাবে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার ও সমাজের কাছে আইনগত প্রতিকার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘনের এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে, উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইন শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আহ্বান জানান, “এমন প্রক্রিয়া থেকে আমাদের সমাজের মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি।”




