জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউ ইয়র্কে শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (Free Trade Agreement – FTA) স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। বৈঠকে তোবগে স্পষ্টভাবে জানান যে ভুটানের সাম্প্রতিক উদ্যোগ Gelephu Mindfulness City (GMC) নামের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে বাংলাদেশের কুড়িগ্রামে গড়ে ওঠা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুযোগ রয়েছে এবং এই সংযোগ কার্যকর হলে বাংলাদেশ-ভুটানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক শুধু পণ্য বাণিজ্য নয় বরং বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতি ঘটাবে।
27 September 2025 | Pic: Collected
বর্তমানে বাংলাদেশ ভুটান থেকে মূলত ফল, শাকসবজি ও কিছু প্রাথমিক কৃষিপণ্য আমদানি করে আর ভুটানে বাংলাদেশের ওষুধ, পাটজাত পণ্য, গার্মেন্টস এবং সিরামিকসের বাজার রয়েছে; কিন্তু উভয় দেশের মধ্যে শুল্ক কাঠামো, সীমান্ত শর্ত ও পরিবহন সমস্যার কারণে বাণিজ্য খুব বেশি প্রসারিত হয়নি। তাই ভুটান বিশ্বাস করে, একটি এফটিএ স্বাক্ষরের মাধ্যমে কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ হবে, পরিবহন খরচ কমবে এবং দুই দেশের মধ্যে ‘ডিউটি ফ্রি’ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ভুটান বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং বলেছে যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ঔষধ ভুটানের স্বাস্থ্য খাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর পাশাপাশি ভুটান বাংলাদেশের সহায়তায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সংযোগ বাড়াতে চায়, যাতে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে ভুটান বিশ্বের অন্যতম জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ সরবরাহে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য হলো পার্বত্য অঞ্চল ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করা, যা ভুটানের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন হলে দেশের বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈঠকে অধ্যাপক ইউনূস প্রস্তাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান এবং বলেন যে মুক্ত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে এবং ভুটানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।
তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান, যা তোবগে গ্রহণ করেছেন এবং জানিয়েছেন যে আগামী ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে তিনি ঢাকা সফর করতে পারেন। এই সফরকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বৈঠকে শুধু অর্থনীতি নয়, আঞ্চলিক মানবিক ইস্যুও আলোচিত হয়। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান এবং ঘোষণা করেন যে ৩০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে আয়োজিত রোহিঙ্গা ইস্যুকেন্দ্রিক মৌলিক অধিবেশনে তিনি অংশ নেবেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য, কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরতে আঞ্চলিক সমর্থন পাওয়া জরুরি। অতীতে বাংলাদেশ ও ভুটান সম্পর্ককে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক হিসেবে দেখা গেছে—১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম ভুটানই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় দুই দেশ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক চুক্তি করেছে। তবে এবারের এফটিএ প্রস্তাবকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বিশেষ সুবিধা তৈরি হবে, কারণ ভুটান একটি ছোট বাজার হলেও এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও তিব্বতের বাণিজ্য সংযোগের কেন্দ্র হতে পারে।
পাশাপাশি কুড়িগ্রামের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল যদি ভুটানের জিএমসি’র সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে শিল্পায়ন, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরির বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হবে। সমালোচকরা অবশ্য সতর্ক করেছেন যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন উভয় দেশের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন, শুল্কনীতির সামঞ্জস্য ও লজিস্টিক সমাধান, নইলে কাগুজে চুক্তির বাইরে এর কার্যকারিতা থাকবে না। তারপরও, নিউ ইয়র্ক বৈঠকটি বাংলাদেশ-ভুটান সম্পর্ককে বহুমাত্রিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার নতুন পথ দেখিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য। সবমিলিয়ে, নিউ ইয়র্কের এই আলোচনার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েছে যে বাংলাদেশ ও ভুটান কেবল প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং অর্থনৈতিক সহযোগী হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে আরও ঘনিষ্ঠভাবে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত।




