আমেরিকার ওরেগন অঙ্গরাজ্যের পোর্টল্যান্ড শহর কয়েক সপ্তাহ ধরেই সহিংস বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সম্পত্তি ভাঙচুরের কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন সেখানে সেনাবাহিনী পাঠানোর। ট্রাম্পের দাবি, স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, আমেরিকাকে আবার নিরাপদ করতে হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। পোর্টল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলন, পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ডানপন্থী গোষ্ঠীর পাল্টা বিক্ষোভ চলছে। একদিকে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন, বৈষম্য ও পুলিশি বর্বরতা থামাতে না পারলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, লাগাতার ভাঙচুর ও সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে বলেন, “যদি স্থানীয় গভর্নর ও মেয়ররা দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে আমাকে সেনা পাঠাতে হবে।
28 September 2025 | Pic: Collected
আমরা দেশকে অরাজকতায় ডুবে যেতে দেব না।” তাঁর এই বক্তব্যের পরই আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমন করতে সেনা পাঠানো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ। ওরেগনের গভর্নর ও পোর্টল্যান্ডের মেয়র ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে তাঁরা কেন্দ্রীয় সেনা হস্তক্ষেপ চান না। তাঁদের দাবি, স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম। তবে বাস্তবে প্রতিদিনই নতুন সংঘর্ষ, দোকানপাটে ভাঙচুর, সরকারি ভবনে হামলা এবং পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘাত ঘটছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, পুলিশের গুলি ছোড়া, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ এবং পাল্টা হিসেবে বিক্ষোভকারীদের পাথর ও আগুন ছোড়ার ঘটনা। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত আমেরিকায় নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
রিপাবলিকান সমর্থকরা মনে করেন, এটি সাহসী পদক্ষেপ যা দেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে ফায়দা নিতে চাইছেন। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের কিছু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, সেনা দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মোকাবিলা করলে আরও বড় মানবাধিকার সংকট তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠোরপন্থী করে তুলবে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক আন্দোলন দমনে সেনা নামানো নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিবারই এটি বিতর্ক তৈরি করেছে। ১৯৬০-এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলন দমনে সেনা ব্যবহার এবং ২০২০ সালে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের সময় ফেডারেল বাহিনী মোতায়েন—এসবই আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত ঘটনা। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।
ইতোমধ্যেই পোর্টল্যান্ডের রাস্তায় সাধারণ মানুষ ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ী মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সেনা হস্তক্ষেপ হলে সহিংসতা আরও বেড়ে যেতে পারে এবং ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। অপরদিকে, অনেক সাধারণ নাগরিক মনে করছেন, সেনা না নামালে এই সহিংসতা কখনো থামবে না। সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সেনা পাঠানোর ঘোষণায় আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গন যেমন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, বাস্তবে সেনা নামানো হলে পরিস্থিতি শান্ত হয় নাকি আরও জটিল হয়ে ওঠে।



