মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার উপকূলে অবৈধ মাদকবাহী একটি জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হামলা চালিয়েছে এবং ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার স্থলভূমিতেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। রোববার (৫ অক্টোবর) ভার্জিনিয়ার নরফোক নৌ স্টেশনে এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ‘কার্টেল সন্ত্রাসীদের’ দমন অভিযানে অংশ নিয়েছে। তার দাবি, এই অভিযানগুলো মাদক পাচার রোধে বিশাল ভূমিকা রাখছে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন আরও সক্রিয়ভাবে নজরদারি চালাচ্ছে।
7 Oct 2025 | Pic: Collected
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী সম্প্রতি একটি সন্দেহজনক জাহাজে অভিযান চালিয়ে প্রচুর পরিমাণ অবৈধ মাদক জব্দ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের ‘মাদক সন্ত্রাসী’ হিসেবে শনাক্ত করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, এই হামলার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন আগেই দেওয়া হয়েছিল এবং এটি সম্পূর্ণ বৈধ অভিযান ছিল। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ভিডিও প্রকাশ করা হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে এই পদক্ষেপের ব্যাপারে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এই হামলাকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অনুচিত পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের সামরিক কার্যক্রম ক্যারিবীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো মার্কিন হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এটি তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
মাদুরো প্রশাসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে, আর এবার মাদকবিরোধী অভিযানের অজুহাতে সামরিক আগ্রাসনের পথ নিচ্ছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করেছে এবং মাদক কার্টেলদের ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। তারা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ল্যাটিন আমেরিকার সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলবে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে অন্তত চারটি পৃথক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অংশ নিয়েছে, যেখানে মোট ২১ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানগুলো সফলভাবে মাদক পাচারের প্রবাহ রোধ করেছে এবং এখন যুক্তরাষ্ট্র ‘দ্বিতীয় ধাপের পর্যবেক্ষণ’ চালাচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি মাদকবিরোধী অভিযান নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত এক সামরিক প্রদর্শন।
২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে। তখন ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দেয়, যার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান ঘটনাটি দুই দেশের উত্তেজনা আরও গভীর করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তেলনির্ভর অর্থনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সংঘাত এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার রূপ নিয়েছে। রাশিয়া ও চীনের সমর্থন পাওয়ায় মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে ‘নব-উপনিবেশিক হুমকি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন স্থল অভিযান শুরু হলে ল্যাটিন আমেরিকায় নতুন এক আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এখন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে নয়, বরং বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে এক নতুন টানাপোড়েনের সূচনা করতে পারে।



