বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম হঠাৎ করেই ভয়াবহভাবে কমে গেছে, যা গত ১২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় একদিনের পতন হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠে ট্রয় আউন্স প্রতি প্রায় ৪,৪০০ ডলারে পৌঁছায়, কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে মঙ্গলবার তা নেমে আসে প্রায় ৪,১২০ ডলারে, অর্থাৎ প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশ পতন। এই ধস কেবল স্বর্ণেই সীমাবদ্ধ নয়; রুপার দামও এক দিনে প্রায় ৭–৮ শতাংশ পড়ে যায়। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে — দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির পর বাজার অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়েছিল, বিনিয়োগকারীরা বড় মুনাফা তুলতে চাওয়ায় ব্যাপক প্রফিট-টেকিং শুরু হয়। পাশাপাশি, মার্কিন ডলারের হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণকে কম আকর্ষণীয় করে তোলে।

22 Oct 2025 | Pic: Collected
একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। ভারতের দিওয়ালি-পরবর্তী সময়ে স্বর্ণ কেনার চাহিদা কমে যাওয়া এবং চীনের অর্থনীতিতে ধীরগতি দেখা দেওয়াও এই পতনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। Citi Research জানায়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় স্বর্ণের দাম স্বাভাবিকভাবে সংশোধনের পথে আছে, যা বাজারের জন্য এক ধরনের ‘রিয়্যালাইনমেন্ট’। মার্কেটওয়াচের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ বেড়েছিল, ফলে এই পতনকে বড় ধরণের সংশোধন হিসেবেই দেখা হচ্ছে, সম্পূর্ণ রিট্রেসমেন্ট নয়। এদিকে, স্বর্ণ খনি কোম্পানি যেমন Newmont Corporation এবং Van Eck Gold Miners ETF (GDX)-এর শেয়ারও ৯ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, স্বর্ণকে কেবল নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরে রাখলে আজকের মতো অস্থিরতায় বিপাকে পড়তে হয়, কারণ বাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা (volatility) ক্রমেই বাড়ছে। যেসব বিনিয়োগকারী সম্প্রতি উচ্চ দামে স্বর্ণ কিনেছেন, তাদের মানসিক প্রস্তুতি থাকা উচিত, কারণ স্বল্পমেয়াদে দাম আরও নিচে নামতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং বর্তমান পতনকে অনেকেই ‘করেকশন ফেজ’ হিসেবে দেখছেন। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি ভবিষ্যতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পায়, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বা যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ে, কিংবা ডলার দুর্বল হয়, তবে আবারও স্বর্ণের দাম দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে গহনা ও স্বর্ণবারে বিনিয়োগ করে, সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব খুব দ্রুত প্রতিফলিত হয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগকারীদের উচিত অতিরিক্ত সতর্ক থাকা, উচ্চ দামে কেনার পরিবর্তে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষা করা। যাদের হাতে ইতিমধ্যে স্বর্ণ রয়েছে, তাদের জন্য এই ধস আতঙ্কের নয় বরং ধৈর্যের পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, স্বর্ণে বিনিয়োগ সবসময় মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে করা উচিত, কারণ স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে। সার্বিকভাবে বলা যায়, রেকর্ড উচ্চতার পর এই আকস্মিক পতন স্বর্ণবাজারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তবে ইতিহাস বলছে, স্বর্ণ সবসময়ই পুনরুদ্ধার করে, তাই আতঙ্কের পরিবর্তে বিশ্লেষণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




