নিউ ইয়র্ক সিটির ২০২৫ সালের মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানি নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নিউ ইয়র্কের মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। গত ২৫ অক্টোবর নিজের এক্স (পূর্বে টুইটার) একাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “এই শহরে এক মিলিয়নেরও বেশি মুসলিম বাস করেন, কিন্তু আজও তাদের মর্যাদা শর্তসাপেক্ষ। এখনো অনেক মুসলিমকে নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হয়, শুধুমাত্র নিরাপদ বোধ করার জন্য।” তাঁর এই বক্তব্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং নিউ ইয়র্কজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। মামদানি বলেন, “প্রত্যেক মুসলিম চায় অন্য যেকোনো নিউ ইয়র্কবাসীর মতোই স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে। কিন্তু আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বলা হয়েছে, কম আশা করতে, অপমান সহ্য করতে, ঘৃণার মুখেও নীরব থাকতে। এই বাস্তবতা আর চলতে পারে না।” তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান, এখন সময় এসেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ার, নিজেদের কণ্ঠে নিজেদের গল্প বলার।

26 Oct 2025 | Pic: Collected
ভিডিও বার্তায় মামদানি আরও বলেন, “রাজনীতি বা সমাজে মুসলমানদের ভূমিকা সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের শেখানো হতো— যেটুকু সুযোগ পেয়েছো, তাতেই সন্তুষ্ট থাকো, কৃতজ্ঞ থাকো, কিন্তু কখনোই আওয়াজ তুলো না।” তিনি জানান, যখন তিনি রাজনীতিতে প্রথম প্রবেশ করেছিলেন, তখন একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস যেন গোপন রাখেন। মামদানির মতে, এই ধরনের সতর্কতা এসেছে বহু বছরের বৈষম্য, অবিশ্বাস এবং ভয় থেকে, যা নিউ ইয়র্কসহ পুরো আমেরিকার মুসলিমদের মানসিকতায় গভীর দাগ ফেলেছে। কিন্তু এখন, তিনি ঘোষণা করেছেন— “আমি আর লুকিয়ে থাকার রাজনীতি করবো না। আমি গর্বের সঙ্গে বলি, আমি একজন মুসলিম, একজন অভিবাসীর সন্তান, এবং নিউ ইয়র্কবাসী।”
এই বক্তব্যের মাধ্যমে মামদানি যেন নতুন প্রজন্মের মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছেন। তাঁর ভাষায়, “যে শিশুটি প্রতিদিন স্কুলে নিজের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, সে যেন জানে— তার নামও সমান সম্মানের। যে নারী প্রতিদিন হিজাব পরে ট্রেনে উঠতে ভয় পায়, সে যেন জানে— এই শহর তারও।” এর আগে ২৪ অক্টোবর ব্রঙ্কসের এক মসজিদের বাইরে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি নিজের পারিবারিক স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, “২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর আমার খালা আর সাবওয়েতে উঠতেন না। শুধু কারণ, তিনি হিজাব পরতেন এবং প্রতিদিনই ভয়ের সঙ্গে বাঁচতেন।” এই বাস্তবতা তিনি বদলাতে চান, এমনটাই জানান নিউ ইয়র্কের এই তরুণ নেতা।
জোহরান মামদানি, যিনি আসলে উগান্ডা-জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক, বর্তমানে নিউ ইয়র্কের কুইন্স এলাকা থেকে স্টেট অ্যাসেম্বলি সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। ২০২০ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন— কারণ নিউ ইয়র্কে এটাই ছিল মুসলিম বংশোদ্ভূত কারও প্রথম এমন সাফল্য। তাঁর প্রচারণা দল ‘Mamdani for Mayor’ জানিয়েছে, এই ভিডিও বার্তার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাহস জাগানো এবং তাদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।
তবে তাঁর এই অবস্থানকে সবাই স্বাগত জানায়নি। বিশেষত ইসলামোফোবিয়া নিয়ে করা তাঁর কিছু মন্তব্যের কারণে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, এবং কয়েকজন কনজারভেটিভ বিশ্লেষক তাঁর সমালোচনা করেন। তারা অভিযোগ করেন, মামদানি “ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার” বানাচ্ছেন। তবে মামদানি এর জবাবে বলেন, “আমি কোনো ধর্মীয় রাজনীতি করছি না, আমি মানবিক রাজনীতি করছি। আমি এমন এক নিউ ইয়র্ক চাই, যেখানে সবাই নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য সিটি এবং পলিটিকোসহ স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণে বলছে, মামদানির এই বক্তব্য নিউ ইয়র্কের মুসলিম ভোটারদের কাছে বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে। শহরের আনুমানিক দশ লক্ষাধিক মুসলমানের মধ্যে অনেকেই ২০২৫ সালের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। বিশেষ করে, ব্রঙ্কস, কুইন্স এবং ব্রুকলিন এলাকায় মুসলিম ভোটের হার উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মামদানির এই বার্তা মুসলিম ভোটারদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং নতুন প্রজন্মকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করতে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মামদানি শেষবারের মতো তাঁর বার্তায় বলেন, “আমরা চুপ থাকবো না। আমরা কম আশা করবো না। আমরা গর্বের সঙ্গে বলবো— আমরা নিউ ইয়র্কের অংশ, আমরা এই শহরের প্রাণ।” তাঁর এই বার্তায় প্রতিফলিত হয়েছে শুধু একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং এক মানবিক অঙ্গীকার— এমন এক সমাজ গড়ে তোলা যেখানে বৈচিত্র্য মানে ভয় নয়, বরং শক্তি।




