গ্রিন কার্ড প্রত্যাশী বিদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস)। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করা ইবি-৫ ভিসা প্রোগ্রামকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী করতে নতুন নিয়ম প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনে একদিকে যেমন আবেদন ফি কমানো হয়েছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটিকে আরও আধুনিক ও দ্রুতগতির করা হচ্ছে। ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়মে আই-৫২৬ এবং আই-৫২৬ই ফর্মের আবেদন ফি প্রায় ১৪ শতাংশ কমানো হবে, আর আই-৮২৯ ফর্মের ফি কমানো হচ্ছে প্রায় ১৭ শতাংশ। পাশাপাশি, ডিজিটাল ফাইলিং এবং ডেটা প্রসেসিং উন্নত করার জন্য ৯৫ ডলারের একটি নতুন প্রযুক্তি ফি যুক্ত করা হয়েছে, যাতে আবেদন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও অনলাইনভিত্তিক হয়।

26 Oct 2025 | Pic: Collected
ডিএইচএসের এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইবি-৫ প্রোগ্রামকে আরও কার্যকর এবং বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করা। ইবি-৫ ভিসা যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী এমন একটি কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা ক্যাটাগরি, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মার্কিন অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দার (গ্রিন কার্ড) সুযোগ দেয়। সাধারণত, একজন বিনিয়োগকারীকে কমপক্ষে ৮ লাখ ডলার (Targeted Employment Area বা গ্রামীণ অঞ্চলে) বা ১০ লাখ ৫০ হাজার ডলার (সাধারণ এলাকায়) বিনিয়োগ করতে হয়, এবং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কমপক্ষে ১০ জন আমেরিকান নাগরিকের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হয়।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ইবি-৫ আবেদনকারীদের প্রাথমিক আবেদন (Form I-526 বা I-526E) জমা দিতে হয় ১১,১৬০ ডলার ফি দিয়ে, যার মধ্যে ৩৫ ডলার প্রযুক্তি ফি হিসেবে নেওয়া হয়। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত নিয়মে এই ফি কমিয়ে আনা হচ্ছে ৯,৬২৫ ডলারে— অর্থাৎ প্রায় ১,৫৩৫ ডলার বা ১৪ শতাংশ কমানো হচ্ছে। একইভাবে, স্থায়ী বাসিন্দার শর্ত অপসারণের জন্য ব্যবহৃত আই-৮২৯ ফর্মের ফিও আগের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমানো হচ্ছে, ফলে যারা ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করেছেন তাদের আর্থিক বোঝা কিছুটা কমবে।
শুধু তাই নয়, ডিএইচএস নতুন করে আই-৫২৭ নামে একটি ফর্ম চালু করেছে, যা মূলত তাদের জন্য তৈরি যাদের রিজিওনাল সেন্টার বন্ধ বা স্থগিত হয়ে গেছে। এই ফর্মের মাধ্যমে তারা তাদের বিনিয়োগের অনুমোদন পুনরায় সক্রিয় করতে পারবেন। বিশেষত, যারা মার্চ ২০২২ সালের আগে আবেদন করেছিলেন এবং এখনও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন, তারা এই ফর্মের মাধ্যমে পুনরায় তাদের গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারবেন। ডিএইচএস জানায়, এই পদক্ষেপটি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক জটিলতা দূর করবে।
ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (USCIS) জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে আবেদন প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে এবং ভিসা অনুমোদনের হার বাড়বে। কারণ, বর্তমানে ইবি-৫ প্রোগ্রামে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ২ থেকে ৪ বছর সময় লাগে, যা অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য নিরুৎসাহজনক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবেদন জমা, ফি পেমেন্ট, এবং আপডেট ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুর ফলে আবেদনকারীরা সহজেই নিজেদের অগ্রগতি জানতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলের অংশ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মার্কিন সরকার চায় বিদেশি মূলধনকে দেশে নিয়ে এসে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে। ইতিমধ্যে, ২০২৩ সালেই ইবি-৫ প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ এসেছে, যার একটি বড় অংশ এসেছে ভারত, চীন ও বাংলাদেশ থেকে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার উদ্যোক্তারা এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমেরিকায় স্থায়ী বসবাসের পাশাপাশি নিজেদের ব্যবসার পরিধি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করছেন।
ব্লুমবার্গ ল এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিএইচএসের এই পদক্ষেপ ইবি-৫ প্রোগ্রামের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। কারণ, বিগত কয়েক বছর ধরে জটিল কাগজপত্র, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অতিরিক্ত ফি-র কারণে এই প্রোগ্রাম অনেকের কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। নতুন ফি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সেই সমস্যাগুলো দূর করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিএইচএস জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মটি ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ কার্যকর করা হবে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো নিয়ে জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, যাতে আগ্রহী বিনিয়োগকারী ও আইনজীবীরা নিজেদের মতামত জানাতে পারেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইবি-৫ প্রোগ্রামের নতুন নিয়ম বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দরজা আরও প্রশস্ত করছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি শুধু গ্রিন কার্ডের পথ সহজ করছে না, বরং আমেরিকার অর্থনীতিতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার করছে। এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগবান্ধব নীতিতে অটল, যেখানে বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক সহজ।




