২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন—ভার্জিনিয়া, নিউ জার্সি ও নিউইয়র্ক সিটিতে—ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রার্থীরা বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। এই তিনটি নির্বাচনে জয়লাভ করে দলটি শুধু রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কাই দেয়নি, বরং মার্কিন রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা দিয়েছে যে ভোটাররা আবারও ডেমোক্র্যাটদের প্রতি আস্থা রাখছে। এই ফলাফলকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী (midterm) নির্বাচনের দিকনির্দেশক হিসেবে দেখছেন, যেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার ১৫ শতাংশ পয়েন্ট ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে তিনি রাজ্যের প্রথম নারী গভর্নর হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন। স্প্যানবার্গার আগে কংগ্রেস সদস্য ছিলেন এবং তাঁর প্রচারণায় প্রধান ইস্যু ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি এবং নারী অধিকার। নির্বাচনের পর তিনি এক বক্তৃতায় বলেন, “এই জয় কেবল আমার নয়, এটি ভার্জিনিয়ার প্রতিটি নাগরিকের—যারা বিশ্বাস করে যে ঐক্য, সহমর্মিতা ও সততার মাধ্যমে রাজ্যকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।” এই জয়কে অনেকেই ‘ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে জনগণের নীরব প্রতিবাদ’ হিসেবে দেখছেন।
5 Nov 2025 | Pic: Collected
একইভাবে নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবারও বড় ব্যবধানে জয় পান। রিপাবলিকান প্রার্থীরা অর্থনীতি ও অভিবাসন ইস্যুতে প্রচারণা চালালেও ভোটারদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যায়। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, এবং শিক্ষা খাতে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় ভোটাররা রিপাবলিকান প্রশাসনের প্রতি হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সহজ জয় পান, যেখানে রিপাবলিকান সমর্থিত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হারিয়ে তিনি বড় ব্যবধানে বিজয়ী হন। এই জয়কে অনেকে “বিগ অ্যাপল”-এ উদারনীতির পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখছেন। এই ফলাফল নিউইয়র্ক রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচার, ভাড়াবাড়ির সংকট, এবং নাগরিক অধিকার ইস্যু আবারও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটদের এই ধারাবাহিক জয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে তাঁর Truth Social প্ল্যাটফর্মে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “আমি এসব নির্বাচনে প্রার্থী ছিলাম না। কিছু অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক সমস্যার কারণে রিপাবলিকানরা সমস্যায় পড়েছে। তবে আমরা এখনো শক্তিশালী।” তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আত্মপক্ষ সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।
টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপদেষ্টা এই ফলাফলকে ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা মনে করছেন, জনগণ হয়তো ট্রাম্পের বিতর্কিত নীতি, বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসা, এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাজেট কাটছাঁট—এসব সিদ্ধান্তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অনেক রিপাবলিকানও এখন দলীয় নীতি পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনটি রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় আসলে ভোটারদের মানসিকতার পরিবর্তনের প্রতিফলন। ২০২০ সালে জো বাইডেনের নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেলেও ২০২৪ সালে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ আবারও বেড়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের এই নির্বাচনে জনগণ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা আর কেবল দল নয়, বরং ‘নীতিনির্ভর নেতৃত্ব’ চায়।
রয়টার্স জানায়, এসব নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভোটার উপস্থিতি। ভার্জিনিয়ায় ভোটার উপস্থিতি ছিল রেকর্ড ৬৫ শতাংশ, যা সাধারণত মাঝারি মেয়াদের নির্বাচনে দেখা যায় না। নিউ জার্সি ও নিউইয়র্কেও প্রায় একই ধরনের উচ্চ উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এটি প্রমাণ করে যে জনগণ এখন আবার সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে।
ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশ্ববাজারেও এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে মার্কিন অর্থনীতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ফিরবে। মার্কিন ডলারের মান সামান্য বেড়েছে, আর ওয়াল স্ট্রিট সূচকগুলোও স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা এখন নিজেদের নীতি পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে। দলীয় সূত্রের বরাতে BBC জানিয়েছে, রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে এখন নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেক সিনেটর মনে করছেন, দলের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য ট্রাম্পের প্রভাব কিছুটা সীমিত করা প্রয়োজন।
এদিকে, ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দলীয় জয় নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, “এই জয় আমেরিকান গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা ও ভবিষ্যতের প্রতি আশার প্রতিফলন।” তিনি আরও বলেন, “এখন সময় এসেছে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার—যাতে রাজনীতি নয়, জনগণের স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফলাফল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির দিক পরিবর্তনই নয়, বরং আগামী দুই বছরে বৈশ্বিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিই নির্ধারণ করে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা কাঠামোর দিকনির্দেশনা। ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য যদি অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্ব হয়তো আরও উদার ও সহযোগিতামূলক আমেরিকাকে দেখবে।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৫ সালের এই নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ভারসাম্যের নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে। ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ট্রাম্প ও তাঁর দলকে কৌশলগতভাবে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। এখন প্রশ্ন হলো—এই গতি ধরে রাখতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা, নাকি রিপাবলিকানরা আবারও শক্তভাবে ফিরে আসবে? সময়ই বলবে আমেরিকার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গল্প।



