যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে করুণ পরিণতি হয়েছে এক তরুণ ভারতীয় ছাত্রীর। মাত্র ২৩ বছর বয়সী রাজ্যালক্ষ্মি ‘রাজি’ ইয়ারলাগাড্ডা, যিনি আন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুর জেলার করমেচেডু গ্রামের বাসিন্দা, কর্পাস ক্রিস্টি শহরের এক ফ্ল্যাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছেন। স্থানীয় সময় শনিবার সকালে তার বন্ধু ও রুমমেটরা প্রথমে বুঝতে পারেন, রাজি বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘুম থেকে উঠছেন না। বহুবার ডাকাডাকির পর দরজা না খোলায় তারা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঢুকে রাজিকে অচেতন অবস্থায় পায়, এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

11 Nov 2025 | Pic: Collected
স্থানীয় পুলিশ জানায়, রাজির মৃত্যুর কারণ প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বা খুন নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে, বরং তা স্বাভাবিক মৃত্যুও হতে পারে। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য মেডিক্যাল এক্সামিনারের (প্যাথলজিস্টের) টিম ময়নাতদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজির শরীরে আঘাতের কোনো দাগ পাওয়া যায়নি, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা বা হার্ট ফেইলিওর হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজি সম্প্রতি টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি–কর্পাস ক্রিস্টি (Texas A&M University–Corpus Christi) থেকে ডেটা অ্যানালিটিক্সে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে তিনি ডিগ্রি শেষ করে নতুন চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তিনি প্রায়ই ফোনে বলতেন—তিনি আমেরিকায় নিজের জীবন গড়ে তুলতে চান এবং খুব শিগগির দেশে ফিরে গিয়ে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চান। রাজির বাবা একজন কৃষক, আর মা গৃহিণী। একমাত্র মেয়ের এমন মৃত্যু তাদের জীবনে গভীর অন্ধকার নেমে এনেছে।
রাজির এক বন্ধু জানিয়েছেন, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি প্রচণ্ড কাশি ও বুকে ব্যথায় ভুগছিলেন। প্রথমে সাধারণ সর্দি–কাশি মনে করে তিনি স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাচ্ছিলেন, কিন্তু অবস্থার অবনতি হয়। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই ঘটল অঘটন।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের স্বাস্থ্যবীমা, মানসিক চাপ ও আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। ভারতীয় কমিউনিটি সংগঠন ‘টেলুগু অ্যাসোসিয়েশন অফ নর্থ আমেরিকা’ (TANA) ও ‘Indian Students Association’ রাজির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা মরদেহ দ্রুত ভারতে পাঠানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এদিকে রাজির এক আত্মীয় যুক্তরাষ্ট্রে GoFundMe প্ল্যাটফর্মে একটি ফান্ডরেইজিং ক্যাম্পেইন শুরু করেছেন। এই তহবিল থেকে রাজির মরদেহ ভারতে পাঠানোর খরচ, শিক্ষার বকেয়া ঋণ, এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তায় ব্যয় করা হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই এই ফান্ডে হাজারো মানুষ অনুদান দিয়েছেন। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, “আমরা এমন প্রতিভাবান তরুণদের হারাতে পারি না, যারা জীবনের সেরা সময়েই চলে যাচ্ছে।”
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে ইতোমধ্যেই এই খবর বড় আকারে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া হাজারো শিক্ষার্থীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না। কয়েক সপ্তাহ আগেও শিকাগো, ডালাস ও নিউইয়র্কে কয়েকজন ভারতীয় ছাত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
রাজির পরিবারের দাবি, তাদের মেয়ে কখনোই আত্মহত্যা করতে পারেন না। তারা মনে করেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পড়াশোনার চাপ ও বিদেশে একাকীত্বের কারণেই হয়তো তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। ভারতীয় দূতাবাস বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং হাজারো বিদেশি শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার প্রশ্ন তুলেছে। উন্নত জীবনের আশায় যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের জন্য এটি এক গভীর বার্তা—শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে উপেক্ষা করা মানে নিজের জীবনের ঝুঁকি বাড়ানো।




