২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে এক ঐতিহাসিক নির্বাচন ও গণভোট একসাথে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এবং এই নির্বাচনের প্রস্তুতি নতুন ধাপে প্রবেশ করে ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে সকাল ৭:৩০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা পর্যন্ত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে কারণ এবারের ভোটে শুধু জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়, একই দিনে “July Charter” নামে পরিচিত সংবিধান সংশোধনী বিষয়ে একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে তাই ভোটারদের চাপ ও সময় ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে এক ঘণ্টা সময় বাড়ানো হয়েছে, যাতে ভোট দিতে আগত সকল মানুষ পর্যাপ্ত সময় পান এবং ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে ও ভোট দিতে যেন কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হন। এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ.এম.এম. নাসির উদ্দিন, ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে। তিনি বলেন, “সতর্কতার সঙ্গে এবং মানুষের সুবিধা মাথায় রেখে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো হয়েছে”, এবং একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে গোপন কক্ষের সংখ্যা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে যাতে প্রতি ভোটার অখণ্ড গোপনীয়তার সঙ্গে ভোট দিতে পারে।
11 Dec 2025 | Pic: Collected
এই সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসছে যখন ২০২৫ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর নতুনভাবে গঠিত নির্বাচন কমিশন এই ভোটের তফসিল ঘোষণা করেছে, এবং এটি হবে কমিশনের অধীনে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ভোটের তফসিল ঘোষণা করার সময় কমিশন জানিয়েছে, মোট ১২ কোটি ৭৬ লাখের বেশি ভোটার এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন, এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবে যেখানে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩ লাখ প্রবাসী ভোটারের নিবন্ধন হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনকে বিস্তারিত পরিকল্পনার সঙ্গে অবহিত করেন, যেখানে ভোটের সময় বাড়ানো অন্যতম বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়, এবং প্রেসিডেন্ট তা যুক্তিযুক্ত ও সহায়ক বলে অভিহিত করেন। কমিশন ভোটার তালিকা আপডেট, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং ভোটকেন্দ্রে পোস্টাল ব্যালট পরিচালনা করার পরিকল্পনা নিয়েও প্রেসিডেন্টকে জানান। এ সময় কমিশন জানিয়েছে ভোটকক্ষে দুটি ধরনের ব্যালট পেপার ব্যবহার হবে একটিতে সংসদ নির্বাচন, আর অন্যটিতে গণভোটের প্রশ্ন থাকবে।
ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর ব্যাপারটি আসলে পরিকল্পিত ছিল আগেই, কারণ নির্বাচন কমিশন মক ভোট নেওয়া হয়েছিল এবং দেখা গিয়েছিল একেবারে ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানো, ব্যালট পড়া, প্রশ্ন বোঝা এবং ভোট দেওয়া সাধারণত একজন ভোটারের জন্য সময় বেশি লাগে। কমিশনাররা বলেছিলেন, “মক ট্রায়াল থেকে দেখা গেছে একজন ভোটার ভোট দিতে তিন থেকে আট মিনিট পর্যন্ত সময় নেন, এবং একই দিনে ভোট ও গণভোট হওয়ায় সময় কম পড়তে পারে।” ফলে ঐ পর্যবেক্ষণও সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আরও যুক্তিযুক্ত করেছিল।
এবারের নির্বাচন শুধু সময় বাড়ানো ছাড়াও একাধিক প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় ৪২,৭৬১টি ভোটকেন্দ্র এবং ২,৪৪,০০০-এরও বেশি বুথ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে ভোটারদের ও প্রচার কার্যক্রমের চাপ সামাল দেওয়া যায়। একই দিনে একটি রেফারেনডাম বা গণভোট অনুষ্ঠানের মতো বড় নির্বাচনী কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ায়, কমিশন বিশেষভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ভোট কক্ষ ব্যবস্থাপনা, ব্যালট বিতরণ, পোস্টাল ব্যালট ও মানুষের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের জন্য অন্যান্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে।
ভোটারদের সুবিধা বাড়ানোর জন্য এই সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে এটি সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ভোটার সেবা সুচারু ও ঝামেলাহীন করা, এবং একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভোটগ্রহণ পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, “যত মানুষ বেশি সময় পাবে, ততই তারা সচেতন ও গভীরভাবে ভোট দেবেন”, এবং এ জন্যই ভোট সময় ছয় ঘণ্টা থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত করা হয়েছে।
সময় বাড়ানোর সুবিধা শুধু লোকজনের জন্য নয় ভোটকেন্দ্রে প্রশাসনিক কাজের জন্যও সুবিধা দেয়। যেমন ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় কর্মকর্তা, বিনা ভর্তুকি এবং ট্রেনিংপ্রাপ্ত ভোটকর্মীরা ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানো, ভোটার যাচাই, ব্যালট বিতরণ, গণনা ও ভোটগ্রহণ পরবর্তী কাজগুলো দ্রুত ও সঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারবেন। এতে করে ভোটগ্রহণের চাপ কমবে এবং ভোটারদের মধ্যে ধীর গতি হলেও সবাই ভোটপদার্থে অংশ নিতে সমান সুযোগ পাবে।
এছাড়া ভোটগ্রহণের নতুন সময়ের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন দুটি নির্বাচনী কার্যক্রম একই দিনে পরিচালিত হলে তা নির্বাচনী প্রকৃতি ও ভোটার সংখ্যা আরও বাড়বে, এবং সময় বাড়ানোর মাধ্যমে ভোটার উপস্থিতি ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকরা দিনের আলোতে নিরাপদভাবে ভোট দিতে পারবে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল বা তাদের প্রতিনিধি বলেছেন, এটি “গণতন্ত্রের দৃঢ়তার প্রতীক” এবং ভোটারদের ভোট দিতে পর্যাপ্ত সময় দেয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
তবে বিশ্লেষকরা এটিও বলেছেন যে সময় বৃদ্ধির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে অবশ্যই ভোট কেন্দ্রগুলোর আপেক্ষিক দূরত্ব, যানজট, বিশেষ করে গ্রামীণ/শহুরে ভিন্নতার কারণে ভোট দেয়ার সুবিধা, এবং ভোট প্রচারের সময়কাল সহ সমস্ত লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলােও সমাধান করতে হবে যাতে ভোটাররা কেবল সময়েই পৌঁছতে পারে না, বরং নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে। এতে করে সার্বিক ভোটের মান অনেক উন্নত হবে এবং ভোটে অংশগ্রহণের মান আরও বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে, ভোটের সময় বাড়ানো সকাল ৭:৩০ টা থেকে বিকেল ৪:৩০ টা সংযুক্ত ভোট এবং গণভোটের সমন্বয়, ভোটার সুবিধা, এবং সার্বিক নির্বাচনী সেবা ও উন্নত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে একটি ঘনিষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ও অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



