বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রাজনীতি নতুন এক উদ্বেগ ও উত্তেজনার পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রতিবেশি দেশের প্রতি রাজনৈতিক বিবৃতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে, এবং এর সর্বশেষ প্রকাশ ঘটেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কর্তৃক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স এলাকা সম্পর্কে দেওয়া মন্তব্যে, যেখানে তিনি বলছেন, “বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করলে বা যারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও মানুষের ভোটাধিকারকে সম্মান করে না তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের কারণে ভারত থেকে সেভেন সিস্টার্সকে আলাদা করে দেওয়া হবে” — এমন এক কূটনৈতিকভাবেই ব্যাখ্যা করা কঠিন, তীব্র এবং বিরোধপূর্ণ হুঁশিয়ারি ভাষা ব্যবহার করেছেন তিনি শুক্রবার (১৫ ডিসেম্বর) শহীদ মিনারের ইনকিলাব মঞ্চে আয়োজিত ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টার সর্বদলীয় প্রতিরোধ সমাবেশে বক্তৃতায়।

17 Dec 2025 | Pic: Collected
এই বক্তব্যে হাসনাত সরাসরি ভারতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সম্ভাবনা, ভোটাধিকার ও মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না, তাদের আশ্রয় দিয়ে সেভেন সিস্টার্সকে আলাদা করার উদ্যোগ নেয়া হবে এবং “এর ফলে যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে তার প্রতিক্রিয়া সারা অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, যারা দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, নির্বাচন ব্যাহত করতে চায় এবং ওসমান হাদির হত্যার সাথে জড়িত রয়েছে — তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ভারত এবং ভারত বাংলাদেশকে বিতর্কিত পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। 
‘সেভেন সিস্টার্স’ বলা হয় ভারতের উত্তরের পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য — অরুনাচল প্রদেশ, অসম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা — যাদের একত্রে প্রকৌশলগতভাবে ভারতের সীমানার ছোবল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং এদের সাথে দেশের বাকি অংশের সংযোগ একটি সরু পথ সিলিগুড়ি করিডোর-এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। 
হাসনাতের এই বক্তব্য একদিকে দেশীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ফল যদিও অন্যদিকে এর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে অনুরোধ জানিয়েছে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে উদ্বেগের কথা জানাতে এবং এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করার দাবি তুলেছে। 
ভারত বিশেষ করে উত্তেজনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, “সেভেন-সিস্টার্স বিচ্ছিন্ন করার হুমকি সহ্য করা হবে না” এবং এমন কোনো পরিকল্পনা বা হুমকি কোনো অবস্থাতেই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতের অখণ্ড ও অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং এ ধরনের উসকানিমূলক মন্তব্য দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্কের প্রতি ক্ষতিকর। 
এই প্রেক্ষাপটে ভারত ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনের নিরাপত্তা ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে কূটনৈতিক স্তরে জোরালো প্রেসার তৈরি করেছে এবং তাকে তার উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে ডাকা হয়েছে। 
অপরদিকে, বাংলাদেশ সরকার বা এর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা হাসনাতের বক্তব্যকে স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগত মন্তব্য বলে মন্তব্য করেছেন এবং সরকার এই ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে বা প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে না বলে স্পষ্ট করেছেন। 
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই মন্তব্য আসলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তাপ, বিরোধী দলীয় দমন, নির্বাচন-সংক্রান্ত বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক হিংসা ও অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে, এবং অদূর ভবিষ্যতে এই ধরণের কূটনৈতিক উত্তেজনা অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 
এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকেও পর্যবেক্ষণ যোগ্য হচ্ছে যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা অনেকে প্রশংসা করেছে এবং বলেছে, “যে ধরনের উসকানি এমন স্তরে দেওয়া হচ্ছে, তা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য উদ্বেগের উদ্রেক।” 
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের উসকানিমূলক বক্তৃতা নতুন করে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্ব ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 
অতএব, হাসনাত আবদুল্লাহর এই মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সীমান্ত নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সংলাপ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে বরাবরের মতোই এক নতুন বিতর্কের শুরুর সংকেত দিয়েছে, যার প্রভাব ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনায় বড় ভূমিকা রাখবে — বিশেষত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে।




