বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার হয়ে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটে কিছু দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতি সহানুভূতির কথাবার্তা প্রকাশ পায়, যা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে অযাচিত নসিহত (unsolicited advice) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। এই মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, এবং তিনি এটিকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করেছেন।

18 Dec 2025 | Pic: Collected
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ১৭ ডিসেম্বর বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বাংলাদেশ নিজে জানে কীভাবে সুষ্ঠু, ন্যায়সংগত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হয়, এবং এ বিষয়ে প্রতিবেশী কোনো দেশের কাছ থেকে উপদেশ বা নসিহত দরকার নেই। তিনি বলেন, “আমরা এখন একটি ভালো নির্বাচন আয়োজনের দিকে এগোচ্ছি, যার পরিবেশ গত ১৫ বছরে কখনো হয়নি। এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হলো কিছু প্রতিবেশী দেশ থেকে উপদেশের চেষ্টা — এটা আমাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।”
তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, শেখ হাসিনা বিরোধী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতে বসে কিছু উসকানিমূলক বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে অনাস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে. তিনি বলেন, “ভারত এখানে নির্বাচন নিয়ে আমাদের কাছে যে নসিহত দিচ্ছে, সেটি পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য বলে আমরা মনে করি, কারণ তারা গত ১৫ বছর ধরে অগণতান্ত্রিক, প্রহসনমূলক নির্বাচনগুলোতে কিছু বলেনি, অথচ এখন যখন আমরা ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথে এগুচ্ছি, তখনই তারা এই ধরনের উপদেশ দিচ্ছে।”
এই মন্তব্যে তৌহিদ হোসেন ভারতের আসল ভূমিকা ও আগ্রহের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন যে বাংলাদেশে ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন লোকসান সৃষ্টি হতে পারে, যা কোনো ভাবেই বাঙালি জাতির সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতি সম্মানজনক নয়। তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, বাংলাদেশ তাদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য কোনো বহিরাগত নির্দেশ গ্রহণ করবে বা প্রতিটি সিদ্ধান্তে প্রতিবেশীদের মতামতকে ভিত্তি বানাবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং আমাদের নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া পুরোপুরি আমাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নীতির উপর নির্ভর করে। আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ নিতে চাই না,” এবং তিনি গ্যারান্টি দেন যে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সকল রাজনৈতিক প্রার্থীরা মিলেই একটি সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি রেখেছেন।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে তারা আশা করে বাংলাদেশ “শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে”, কিন্তু এ বক্তব্যকে বাংলাদেশের সরকার পক্ষ অযাচিত পক্ষোনির্দেশ হিসাবে ও হস্তক্ষেপমূলক বলে অভিহিত করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মন্তব্য ও সমালোচনার প্রতি বাংলাদেশের কঠোর প্রতিক্রিয়া আগামী দিনে ঢাকা‑দিল্লি সম্পর্কের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং এটি কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রেও একটি নতুন অগ্রাধিকার দিক হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষত যখন দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা বেশি তীব্র হচ্ছে, তখন এক প্রতিবেশীর কোনো মন্তব্য অন্য প্রতিবেশীর কাছে হস্তক্ষেপ বলে ধরা পড়লে তা রাজনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের সিদ্ধান্ত, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা পরিকাঠামো সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরকাড়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব নিজেরাই তারা পালন করতে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক “নসিহত” গৃহীত হবে না।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের এই মন্তব্য সম্পূর্ণরূপে দেশের সার্বভৌম নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকারকে জোরদার করে, এবং এটি ধারণাপন্ন কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে একটি শক্ত অবস্থান হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশলগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষিত হচ্ছে।




