জার্মান অ্যারোস্পেস ও মেকাট্রনিক্স প্রকৌশলী মাইকেলা বেন্থাউস সংযুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা ব্লু অরিজিন-এর নিউ শেপার্ড মিশনে ২০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণে অংশগ্রহণ করে ইতিহাস গড়েছেন, যা বস্তুত মানবজীবনের সম্ভাবনা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মহাকাশ অভিযানে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
এদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে টেক্সাসের লঞ্চ সাইট ওয়ান থেকে ব্লু অরিজিনের ৩৭তম নিউ শেপার্ড সাব-অরবিটাল ফ্লাইট (NS-37) উৎক্ষেপণ করা হয়। প্রায় ১০ মিনিটের ওই ফ্লাইটে ক্যাপসুলটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মহাকাশ সীমানা হিসেবে বিবেচিত কারমান লাইন পার করে এবং মাইকেলা সহ অন্যান্য পাঁচ যাত্রী ভারহীনতার মুহূর্ত উপভোগ করেন।

21 Dec 2025 | Pic: Collected
মাইকেলা বেন্থাউস, যিনি বর্তমান বয়স ৩৩ বছর, চার বছর আগে একটি মাউন্টেন বাইক দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। এই ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি; বরং তিনি মহাকাশের প্রতি অনাগ্রহ ধরে রেখেছেন এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির (ESA) একজন অ্যারোস্পেস প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।
ফ্লাইটের পর মাইকেলা বলেন, “আমার দুর্ঘটনার পর আমি বুঝতে পেরেছি আমাদের পৃথিবী এখনও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য অপ্রবেশযোগ্য। যদি আমরা সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের সব ক্ষেত্রেই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে — শুধু পছন্দের জায়গাগুলোতে নয়।”
অভিযানটি কেমন ছিল?
নিউ শেপার্ড ক্যাপসুলটি কারমান লাইন অতিক্রম করে ১০৫ কিলোমিটারের উপরে গেছে। এখানে মাইকেলা ও অন্যান্য যাত্রীরা চার মিনিটেরও বেশি সময় ভারহীন অবস্থায় ভেসে Earth-এর বৃত্তাকৃতি ও মেঘমালা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। এটি মূলত একটি সাব-অরবিটাল অর্থাৎ পুরো স্যাটেলাইটের মতো মহাকাশচালিত নয় — কিন্তু স্পেসের সীমা সমান ভাবে স্পর্শ করেছে।
ব্লু অরিজিনের নিউ শেপার্ড মিশনগুলো মূলত বাণিজ্যিকভাবে খোলা আছে, যেখানে পেশাদার নভোচারী ছাড়াও পাঠক/নাগরিক পর্যটকদের জন্য অল্প সময়ের জন্য মহাকাশ ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে সংস্থাটি মহাকাশ ভ্রমণে মানুষের অংশগ্রহণকে আরও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্য রাখে।
উদ্বোধনী মিশনের সময় মাইকেলার সঙ্গে অন্যান্য যাত্রীরাও ছিলেন, যারা তাদের কক্ষপথ উপরের দিকে ওঠার আগের মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিয়েছিলেন, এবং তাদের মধ্যে একজন সাবেক SpaceX নির্বাহীও রয়েছেন যিনি মাইকেলার জন্য সহায়তা প্রদান করেন।
ইতিহাস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মহাকাশ অভিযান
মাইকেলার এই যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং বিশ্ব মহাকাশ সম্প্রদায়ে মানুষের ভূমিকা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি তৈরিতে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি দেখায় যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো কোনােই ব্যক্তি বা সামাজিক সীমা হিসেবে দাঁড়াতে পারবে না, বরং প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকার সম্পন্ন উদ্যোগ সঠিক সুযোগ প্রদান করলে লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।
মাইকেলার এই মহাকাশ ভ্রমণ ভীষণভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক বলে বিবেচিত হচ্ছে অনেক বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রতিবন্ধী অধিকার কর্মীর কাছে। তিনি জানিয়েছেন যে তার লক্ষ্য শুধু মহাকাশে যাওয়া নয়, বরং মহাকাশজানিত ও পৃথিবীর অভ্যন্তরের অ্যাক্সেসিবিলিটি মান উন্নয়ন করা এবং এমন সুযোগগুলো আরো বেশি মানুষের জন্য তৈরি করা।
ভবিষ্যতে মহাকাশ ভ্রমণের সম্ভাবনা
ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা ভবিষ্যতে মহাকাশ ভ্রমণকে আরও ব্যাপক, সস্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে পরিচালনা করার পরিকল্পনা করছে. এই ধরনের মিশনগুলো বিশেষ শারীরিক চাহিদা সম্পন্ন মানুষ, বৃদ্ধ, বা দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশচালনায় অনভিজ্ঞদের জন্যও দরজা খুলে দিচ্ছে, যা আগের ভেবে দেখা ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করছে।
বর্তমানে মহাকাশচালনার পেশাগত ও সরকারী সংস্থাগুলো যেমন NASA কিংবা ESA দীর্ঘমেয়াদে চাঁদ, মঙ্গল ও ISS-এর মতো আয়োজনে নিত্য নতুন মানবিক সহায়তার সুযোগ সৃষ্টি করতে কাজ করছে, তবে বেসরকারি উদ্যোগগুলি ছোট-মেয়াদী প্রাণবন্ত অভিজ্ঞতা প্রদান করে মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করছে।
এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে মানবিক মাইলফলক ও বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান এধরনের মহাকাশ ভ্রমণে নতুন সুযোগ তৈরির জন্য কৌশল ও নীতি বিকাশের দিকে নজর দিচ্ছে.




