ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অব্যাহত অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে গাজা ভূখণ্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক ভয়াবহ সংকটে পড়েছে এবং ওষুধের অভাবে হাজার হাজার রোগী মৃত্যুর মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার হাসপাতালে মৌলিক ওষুধ, জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী ও ব্যাটারি-চালিত জেনারেটরের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি নিয়ে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছে যে পরিস্থিতি “করুণ, ভয়াবহ ও নজিরবিহীন”, যেখানে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, স্যালাইন, বেদনানাশক ওষুধ, গজ, ডায়ালাইসিস সরঞ্জামসহ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ প্রয়োজনীয় সামগ্রীই পাওয়া যাচ্ছে না এবং হাসপাতালগুলো কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে গেছে। ইসরায়েলের চালু করা অবরোধ ও চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশে বাধার কারণে স্বাস্থ্য কর্মীরা গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছেন না এবং প্রতিদিনের জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের ভয়াবহ ঘাটতির কারণে হাসপাতালগুলোতে মৌলিক চিকিৎসা সেবা চালানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ বলেছেন, “এই সংকট ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ … এখন পরিস্থিতি ভীতিকর।” তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার ছাড়াও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা পায় এমন অসংখ্য রোগী — যেমন গ্লুকোমা, ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার ও হার্টের রোগীরা — তাদের জীবন রক্ষার দায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব বা মৃত্যুর ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। গত কয়েক মাসে ওষুধের তালিকায় অন্তত ৫১০টি চিকিৎসা সামগ্রী সম্পূর্ণভাবে অজশনে রয়ে গেছে, যার মধ্যে জরুরি ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড, অ্যান্টিবায়োটিক এবং বেদনানাশক রয়েছে, সেইসঙ্গে ল্যাবরেটরি টেস্ট ও রক্ত ব্যাংক সরঞ্জামও মারাত্মকভাবে অভাবগ্রস্ত, যার ফলে প্রায় ২০০,০০০ রোগী জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং প্রায় ১০০,০০০ জন শল্যচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
24 Dec 2025 | Pic: Collected
ইসরাইলের বর্বর সামরিক অভিযান ও অবরুদ্ধ অবস্থায় গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রায় হয়ে পড়েছে এবং ২০২৩ সালের অক্টোবার থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘর্ষে প্রায় সব হাসপাতালে আক্রমণ হয়েছে, যেখানে অন্তত ১২৫টি স্বাস্থ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩৪টি হাসপাতাল মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে, এবং ১,৭০০ জনেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা থাকার ফলে চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং হাসপাতালে সেবা নেওয়ার জন্য অবস্থানরত রোগীদের মধ্যে বয়স্ক, শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন যে মেডিকেল সাপ্লাইয়ের অভাব এমন এক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে যেখানে প্রতিটি মৌলিক চিকিৎসা ছাড়া জীবন রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আল-বারশ বলেন যে গাজার বাইরে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের তালিকায় প্রায় ২০,০০০ জন রোগী রয়েছেন, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ইতোমধ্যেই ১৮,৫০০ জনকে অনুমোদন দিয়েছে, এবং প্রায় ৩,৭০০ জনের অবস্থার অবিলম্বে চিকিৎসা প্রয়োজন, কিন্তু সীমান্ত পারাপারের জন্য নিরাপত্তা অনুমোদনে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই সেই সুযোগ না পেয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। তিনি বলেন, “এই দীর্ঘ অপেক্ষা ও জটিল প্রক্রিয়া রোগীদের মৃত্যুর একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” বারশ আরো জানান যে প্রায় ৪,৩০০ শিশু সহ অসংখ্য রোগী বাইরে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছে, তবে সীমান্ত ক্রসিং খোলার জন্য দ্রুততম সময়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না হলে আরো প্রাণহানি ঘটতে পারে।
এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন মানবিক সংগঠন বারবার সতর্ক করে দিয়েছে যে গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের ঘাটতি ও চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকলে অপুষ্টি ও রোগের সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার নেবে এবং আগের তুলনায় অসুস্থতা ও মৃত্যুহার বাড়বে। তিভাগ্রস্ত জনগণ দিনে দিনে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও চিকিৎসা অভাবে আরো বিপন্ন হচ্ছে, এবং বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩২০,০০০ শিশুর অপুষ্টির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। প্রচ্ছন্ন খাদ্য সংকট ও ওষুধের ঘাটতির কারণে মানুষের স্বাস্থ্যে তারুণ্য, গর্ভবর্তী মহিলাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও পূর্ববর্তী চিকিৎসা প্রয়োজনীয় রোগের চিকিৎসা বিজয়ী মানুষগুলোর অবস্থাও শঙ্কাজনকভাবে অধ:পতিত হচ্ছে।
ইসরাইলের অবরোধ ও সহায়তা নিষেধাজ্ঞা মানবিক অপনিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ক্রমাগত তুলে ধরছে। এই সংকট পরিস্থিতিতে রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি, স্থায়ী অক্ষমতা ও অচল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গাজা উপত্যকাকে এখন মানবিক বিপর্যয়ের এক কঠিন পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থার ধ্বংস, ওষুধের ঘাটতি এবং অনুমোদনের দীর্ঘপ্রক্রিয়া মিলিত হয়ে নারী, শিশু ও বয়স্কদের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকারও কার্যত বিলুপ্ত পরিণতির সম্মুখীন।



