ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ যোদ্ধা শহীদ শরীফ ওসমান হাদি-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে ভারতের সরকার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে, এবং বিষয়টি নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক আলোচনাও তীব্র হয়েছে, যেখানে দু’দেশের হাইকমিশনারদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক বার তলব করাও হয়েছে। নিউ দিল্লি-ভিত্তিক বার্তাসংস্থা PTI-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করে হাদির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং বাংলাদেশকে আইনি ও তদন্ত-প্রমাণের দিকগুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে অনুরোধ জানিয়েছে।
24 Dec 2025 | Pic: Collected
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিল্লির অবস্থান হলো যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে ভারতের কিছু সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন অভিযোগ উঠায়, এই ঘটনাটি শান্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্যতেও সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হওয়া উচিত এবং সংশ্লিষ্ট সকল দিকগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি-ঢাকার কূটনৈতিক কার্যক্রম আরো জোরদার হয়ে উঠেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরণের গুরুতর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তের স্বচ্ছতায় আন্তর্জাতিক মানকে ধরে রাখা উচিত এবং এটি স্বচ্ছভাবে করা হলে উভয়পক্ষের সম্পর্কেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে, যেখানে মোটরসাইকেল আরোহী দুই ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশ জানিয়েছে প্রথমে হাদিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর সেখানে রাতেই তিনি মারা যান। এই ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শহরে গণআন্দোলন, ধ্বংসযজ্ঞ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে ভারতের অবস্থান ও উদ্বেগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদে গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের এই উদ্বেগ ব্যক্ত হওয়া শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের বৃদ্ধি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের তীব্রতার প্রেক্ষাপটেও এসেছে, যেখানে হাদির মৃত্যুর পর আন্দোলনকারীদের কিছু অংশ ভারতীয় দূতাবাস ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, অ্যাকশন বা ভাঙচুরের ডাক দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। বার্তাসংস্থা রিপোর্ট করেছে যে হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে কিছু মনোভাবও লক্ষ্য করা গেছে এবং সেই কারণেই নয়াদিল্লি এই হত্যাকাণ্ডে সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ তদন্তের গুরুত্ব আরোপ করেছে।
এ প্রসঙ্গে কূটনৈতিক মহলে আরও বলা হচ্ছে যে হাদির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত তথ্য, প্রমাণ ও সন্দেহভাজনদের অবস্থান সম্পর্কে সরকার কতদূর পন্থা নিয়েছে—এই দিকগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে বের করা প্রয়োজন। সূত্র উল্লেখ করেছে যে ভারতের উদ্বেগটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও নাগরিক নিরাপত্তার দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এই প্রেক্ষাপটে ভারত বলেছে যে তদন্তের স্বচ্ছতা ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করলে উভয় দেশের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতা আরও দৃঢ় হবে।
কারণ, ওসমান হাদি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাবহুল ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তিনি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন, এবং তার মৃত্যু শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলে একটি বড় মানবাধিকার, রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও সাংগঠনিক পরিবেশগত উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে. তার খুনি যে কোথায় গিয়েছিল এবং কীভাবে ঘটনা ঘটে তার বিশদ তদন্ত দাবির সঙ্গে ভারত তার অবস্থান একত্রে তুলে ধরেছে যে যেকোনো দেশের বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে ।
ভারত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নয়াদিল্লিতে দুইবার (২৩ এবং ২৪ ডিসেম্বর) পরস্পর হাইকমিশনাররূপে তলব করেছে, একদিকে হাদি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করে, অন্যদিকে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকেও তলব করে গত কয়েকদিনে কিছু ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ জানানো হয় এবং বাংলাদেশের কূটনীতিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে—এও ভারতের বক্তব্যে আলোচিত হয়েছে।
এই হত্যাকাণ্ড ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলেছেন যে যদি তদন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত হয়, তাহলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন ও স্থির করার পথ খোলা থাকতে পারে; অন্যথায়, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েনে নেতিবাচক ফল পড়তে পারে. বিশেষত যখন হত্যাকাণ্ডটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মীর উপর ঘটেছে এবং সেটা আগামী ২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করেছে, তখন আন্তর্জাতিক সহায়তা ও তদন্ত-প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।



