২০২৫ সালটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে একটি সংঘাতপূর্ণ বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ বছর বিশ্বব্যাপী একের পর এক উত্তেজনা ও যুদ্ধের প্রতিরূপ দেখা গেছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চে। ২০২৫-এর ঘটনাগুলো শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, শক্তি সংঘর্ষ এবং বিরোধী দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এই প্রতিবেদনে আমরা চলতি বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও সংঘাতগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা, তাদের প্রেক্ষাপট, পরিণতি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব তুলে ধরব — বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে, ও ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে।

31 Dec 2025 | Pic: Collected
২০২৫ সালের ১৩ জুন ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ব্যাপক সামরিক সংঘাত শুরু হয়, যা পরে প্রায় ১২ দিন ধরে চলে। এই যুদ্ধ শুরু হয় যখন ইসরায়েল তেহরানের ন্যাটাঞ্জ, ইসফাহান ও অন্যান্য পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা এ আক্রমণ চালায় বলে বলা হয়, যা ইরানকে ঘটনাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বে আক্রমণ হিসেবে দাবি করতে ওঠায়।
ইসরায়েলের এই হামলার উত্তরে ইরান বিশাল সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সন্ত্রাসী ড্রোন ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর ও সামরিক স্থাপনায় চালায়, যা শহুরে এলাকা ও নানাবিধ লক্ষ্যবস্তুকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সঙ্ঘাতের সময় দু’পক্ষই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে — উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাহিনী ও বেসামরিক লোক মারা গেছেন, বহু আহত হয়েছেন এবং এলাকায় বিশাল ধ্বংসাত্মক প্রভাব দেখা গেছে। এই সংঘাত প্রাদেশিক সীমা অতিক্রম করে পরস্পর ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন হামলায় পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র কিছু পর্যায়ে ইসরায়েলের পাশে অবস্থান নেয়, এবং মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। যদিও আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি ও মধ্যস্থতাকারী প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়, তবুও সংঘাতের জটিলতা ও প্রভাব স্থায়ী সুরাহা পাননি।
এই যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ধাক্কা লেগেছে, এবং পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন রুটেও ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, কারণ ইরান পার্সিয়ান উপসাগরের স্বার্তোগ্রাহী যায়গা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে।
২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে একটি ছোট কিন্তু তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে অন্য এক নতুন ধাক্কা দেয়। এই সংঘাত মূলত কাশ্মিরের পেহেলগাম অঞ্চলে ঘটে যেটি দীর্ঘদিন ধরে উভয় দেশের মধ্যে উত্তেজনার স্থান।
ঝটকা-ধরণের এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল একটি গুরুতর সন্ত্রাসী হামলার পর, যেখানে ২৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন বলে রিপোর্ট করা হয়। ভারত ফৌজি ও গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করে, এই হামলার পেছনে পাকিস্তানের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে এবং এর উত্তরে ভারত “অপারেশন সিনদুর” নামে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে।
এই সামরিক উত্তেজনার কারণে কাশ্মির ও সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন ব্যবহারের মতো যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বিগ্ন করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই উত্তেজনাকে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
পাকিস্তান সরকার ভারতীয় দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানায়, যেখানে পাকিস্তানের নেতারা বলছেন যে অন্তর্ভুক্ত সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষে সরাসরি কাজ করেছে কোনো দেশীয় সরকার নয়। যদিও উত্তেজনা সীমিত মেয়াদে স্থগিত করা হলেও উভয় দেশের সম্পর্ক ওপর-নিচ অবস্থায় থাকে।
২০২৫ সালে শুধুমাত্র ভিডিও যুদ্ধ বা সীমান্ত প্রক্ষালনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
- ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও অব্যাহত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিবাদে বড় ভূমিকা রাখছে।
- মধ্যপ্রাচ্যে ইয়েমেন, সিরিয়া এবং গাজা অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা ও মানবিক দুর্দশা আরো জোরদার হয়।
বিশেষ করে সৌদি-ইউএমনির অভিযান, হুঁশিয়ারি ও সামরিক পরিকল্পনা যেমন গাজা বিরতি চুক্তির মাঝেও প্রভাব ফেলেছে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর কাড়ে।
২০২৫-এর এই সংঘাতগুলো শুধু মাত্র সীমান্ত যুদ্ধ বা আঞ্চলিক খণ্ডযুদ্ধ নয়, বরং বিশ্ব শাসন ও নিরাপত্তার স্থিতিশীলতায় বড় সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে:
- আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন এসেছে।
- জ্বালানি ও বিশ্ব বাণিজ্যে স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে তেলের যোগাযোগ মার্গ হরমুজের আশঙ্কার প্রেক্ষিতে।
- কূটনৈতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো কূটনৈতিক সমঝোতা ও আলোচনার পক্ষে হলেও সামরিক সমর্থনও তীরে ঝুলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক শান্তির পথে দৃঢ় উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে এই সংঘাতগুলো পরবর্তী দশকে সমস্যার বৃদ্ধি না করে সমাধানের ক্ষেত্র খুলতে পারে। কিন্তু এর প্রতিফলন মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট হিসেবে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।




